নিজস্ব প্রতিবেদক :
চালকদের জীবিকা ও পরিবারের কথা চিন্তা করে চাইলেই রাজধানী ঢাকা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা উঠিয়ে দেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর আফতাব নগরে তিন চাকার স্বল্প গতির ব্যাটারিচালিত রিকশার পাইলটিং কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি।
সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা বলেন, সবাই বলছে, ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তা উঠিয়ে দিতে। কিন্তু রিকশার পেছনে জীবিকা রয়েছে, পরিবার রয়েছে। তাই চাইলেও ব্যাটারিচালিত রিকশা উঠিয়ে দেয়া যায় না। তবে এসব রিকশা চলাচল শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা হবে।
তিনি বলেন, ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। রাস্তার অভাব রয়েছে, এটা ঠিক কিন্তু এই রাস্তা ব্যবহার করেও আরও বেশি গতি আনা যাবে এবং আরও নিরাপদ যাত্রা করা যাবে।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, আদিলুর রহমানসহ সব উপদেষ্টা আমাকে বলেন যে, ঢাকা শহরে আর ব্যাটারিচালিত রিকশা রাখা যাবে না। এগুলো উঠিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, রিকশা মানে শুধু একটি রিকশা বা একজন চালক নয়। এর পেছনে একটি পরিবার আছে; তাদের জীবন-জীবিকা আছে। সেজন্য আমি বলি—রিকশা উঠিয়ে দেওয়ার চেয়ে শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি।
রাস্তায় বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ঢাকার সড়কে প্রথম যে সমস্যা সেটা হলো বাস নিয়ে। তারা যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। বিশৃঙ্খলার মূল কারিগর বাসগুলো। আমরা বাসের বিশৃঙ্খলা কমানোর জন্য আগামীকাল বা পরশু একটি বাস সার্ভিস উদ্বোধন করবো। যেখানে শুধু নির্দিষ্ট জায়গায় বাস থামবে। যত্রতত্র থামানোর সুযোগ থাকবে না। ক্রমান্বয়ে আমরা বিভিন্ন রুটে বাসের এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করবো।
উচ্চগতির গাড়ি ঢাকার রাস্তায় থাকায় জ্বালানি ও সময় অপচয় হচ্ছে জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা বলেন, ঢাকায় যেসব গাড়ি চলাচল করে, তাতে দেখা যায় তাদের ইঞ্জিনের গতি ঘণ্টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঢাকায় গাড়ি চলাচলের গড় গতি ৬-৭ কিলোমিটার। এতে উচ্চগতির ইঞ্জিন ব্যবহার করা গাড়িগুলোতে ফুয়েলের ব্যাপক অপচয় ঘটছে। সময়ও নষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, গড় গতি কম, তারপরও দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। এটার কারণ হলো বিশৃঙ্খলা, নিয়ম না মানা। ঢাকায় রাস্তা কম, প্রসারিত না; এটা যেমন ঠিক। তেমনি যে রাস্তা আছে, তা শৃঙ্খলা মেনে ব্যবহার করে ঢাকায় গাড়ি চলাচলের গড় গতি বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে নিরাপদ যাত্রাও নিশ্চিত করা সম্ভব। সেজন্য আমরা বুয়েটের তৈরি করা ই-রিকশা চালু করছি। চারটি রুটে এ রিকশা পাইলটিং হিসেবে চালানো হচ্ছে। দ্রুত ই-রিকশা সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে এক ই-রিকশা আমার গাড়ি ঘেঁষে টেনে চলে যায়। নেমে দেখি এক শিশু চালক, প্রশিক্ষণ নেই, ব্রেক খুঁজে পায় না। ডেন্টিং করাতে ২৫ হাজার টাকা লেগেছিল। ৫০০ টাকাও তার জন্য বোঝা হয়ে যেত। তখনই বুঝেছি, সড়ক নিরাপত্তা শুধু আইন বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হবে না, ডিজাইন আর প্রশিক্ষণ দিয়েও করতে হবে।
উপদেষ্টা বলেন, আমরা যাত্রী, পথচারী, গাড়িচালক আর রিকশা চালক সবার জন্য ঢাকা নিরাপদ করতে চাই। পুরনো সমাধান দিয়ে নতুন সংকট সামলানো যাবে না, তাই নতুন চিন্তা আর প্রযুক্তি নিয়ে এগোচ্ছি। লক্ষ্য একটাই, ঢাকাকে আবার বাসযোগ্য নগরীতে ফেরানো।
অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানও। তিনি বলেন, ঢাকা শহর তো এক শ্রেণির মানুষের জন্য না। এখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করেন। বিশেষত যারা শ্রমজীবী মানুষ। তাদের এখানে দৈনন্দিন ভূমিকা অত্যন্ত বিরাট। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও আর্থসামাজিক ভূমিকায় তাদের অবস্থান অত্যন্ত জোরালো।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই-আন্দোলনেও তারা বড় ভূমিকা পালন করেছেন। তাই যেকোনো পরিকল্পনা নেওয়া হোক না কেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা জনবান্ধব হতে হবে। বিশেষ করে যারা শ্রমজীবী মানুষ, তাদের স্বার্থ রক্ষা করে করতে হবে। এ চিন্তা থেকে আজকের এ প্রকল্পের শুরুটা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা রিকশাচালক, তাদের কীভাবে উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে শৃঙ্খলার মধ্যে তাদের সম্পৃক্ত করা যায়। তাদের সম্পৃক্ত করেই ঢাকা শহরে পরিবহন বা চলাচল ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপদ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন; প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আব্দুল হাফিজ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহমুদুল হাসান প্রমুখ।
রাজধানী ঢাকায় ভাইরাসের মতো রিকশা আর বাড়তে দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, রিকশা আর অবৈধ চার্জিং স্টেশনকে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া হবে না। নতুন নকশার রিকশা চলবে নির্দিষ্ট জোনে, নির্দিষ্ট সংখ্যায়, আর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে।
এজাজ বলেন, ‘ডিএমপি প্রতিটি জোন ও ওয়ার্ডভিত্তিক এলাকায় সর্বোচ্চ কত রিকশা চলতে পারবে, সেই সংখ্যা সিটি করপোরেশনকে জানাবে। আমরা সেই হিসাব অনুযায়ী মোট অনুমোদন দেব। অনুমোদনের বাইরে আর কোনো রিকশা নামার সুযোগ থাকবে না। প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে, এটা শতভাগ কার্যকর করা হবে।’
পাইলটিংয়ের জোন বণ্টন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আফতাবনগরে আপাতত পুরোনো ই-রিকশা চলবে, আর সাতারকুলে নতুন নকশার রিকশা পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করবে। ‘কালকেই নতুন রিকশা পাবেন না, কারণ ফ্যাক্টরিগুলো এখন থেকে উৎপাদন শুরু করবে। বাজারদর অনুযায়ী ধীরে ধীরে শিফটিং হবে, যেন চালক ও মালিক উভয়ের পরিবর্তনের সুযোগ থাকে,’ বলেন এজাজ।
চালকদের প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘ইতোমধ্যে ২৪০ জন চালককে লাইসেন্সিং ও ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। ধানমন্ডি-ঝিগাতলা জোনে নতুন রিকশা চলবে, আর মতিঝিলে পুরোনো রিকশার অনুমতি থাকবে এক বছর, নতুন নকশার রিকশার অনুমোদন পাঁচ বছর পর্যন্ত দেওয়া হবে।’
অবৈধ চার্জিং স্টেশন নিয়েও কঠোর অবস্থান জানিয়ে প্রশাসক বলেন, ‘চার্জিং স্টেশন বন্ধ করলে অবৈধ রিকশা এমনিতেই থেমে যাবে, তাই কোন চার্জিং স্টেশন বৈধ, কোনটা অবৈধ– সেটা শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। চার্জিং ব্যবস্থায় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ থাকবে, প্রয়োজনে অবৈধ চার্জিং নেটওয়ার্ক বন্ধের কৌশলও তৈরি করা হচ্ছে।’
এজাজ বলেন, ‘লাইসেন্স, ডিজাইন, গতি নিয়ন্ত্রণ, জোনভিত্তিক সংখ্যা– সব মিলিয়ে আমরা একটি কন্ট্রোল মেকানিজম দাঁড় করাচ্ছি। এতদিন কোনো নিয়ম ছিল না, তাই রিকশা ভাইরাসের মতো বেড়েছে। এখন এটা রেগুলেশন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে আসবে। পাইলট সফল হলে অন্য জোনেও সম্প্রসারণ করা হবে।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিরক্ষা ও সংহতি উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ, বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন, ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মাহমুদুল হাসান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















