নিজস্ব প্রতিবেদক :
চলতি বছর প্রথম ৮ মাসে(জানুয়ারি-আগস্ট) ৩৬১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এরমধ্যে অধিকাংশই নারী শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার হার ৫৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। এছাড়া গত ৮ মাসে আত্মহত্যা করা তাদের মধ্যে স্কুল শিক্ষার্থী ১৬৯ জন, কলেজ শিক্ষার্থী ৯৬ জন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৬৬ জন এবং মাদরাসা শিক্ষার্থী ৩০ জন।
শনিবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে আচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ক্রমবর্ধমান: কোন পথে সমাধান? শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন ও সম্মেলন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসা সেবাগ্রহণকারী নারীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৩২২ জন সেবাগ্রহণকারী নারীর মধ্যে ১৭৭ জনের আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল। এর মধ্যে ৯৮ জন কখনো না কখনো আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এবং ৫ জন চিকিৎসা নেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবনের পরিসমাপ্তি টেনেছে।
২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে আত্মহত্যা করে ৩১ দশমিক ৩০ শতাংশ। এছাড়া খুলনা বিভাগে ১৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ, রংপুরে বিভাগে ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ, ময়মনসিংহ বিভাগে ১০ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং সিলেট বিভাগে আত্মহত্যা করে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি নারী শিক্ষার্থীদের। ৩৬১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৩০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী গত আট মাসে আত্মহত্যা করেছে। অপরদিকে, ৪০ দশমিক ৭০ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।
নারী শিক্ষার্থীদের বেশি আত্মহত্যার কারণ খতিয়ে দেখা যায়, ২৬ দশমিক ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী অভিমান করে, প্রেমঘটিত কারণে ১৮ দশমিক ৭০ শতাংশ, মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, পারিবারিক বিবাদের কারণে ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ, ৫ দশমিক ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী যৌনহয়রানির কারণে এবং পড়াশোনার চাপ ও ব্যর্থতার কারণে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ আত্মহত্যা করেছে।
আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্তর বিবেচনায় দেখা যায় সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা। মোট আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশই ছিল স্কুলগামী।
তাদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ছিল ১১২ জন এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ছিল ৫৭ জন। এছাড়া আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে কলেজগামী শিক্ষার্থী ছিল ২৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং আত্মহননকারীদের মাঝে মাদরাসার শিক্ষার্থী রয়েছে ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস মজুমদার বলেন, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ১৯৯০ সালে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ‘আহছানিয়া মাদক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করে। ২০০৪ সালে এই কর্মসূচির নাম পরিবর্তন করে অ্যাডিকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড কেয়ার (আমিক) নামকরণ হয়। মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার এই উদ্যেগকে আরও ভালো করার লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ১২ এপ্রিল নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র যাত্রা শুরু করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারী মাদকাসক্তরা পুরুষ মাদকাসক্তদের তুলনায় মানসিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে তারা আত্মহত্যার জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকে। ঝুঁকিপ্রবণ জনগোষ্ঠি হিসেবে মাদকগ্রহণকারীরা আত্নহত্যা প্রবণতার উচ্চঝুঁকির মধ্যে আছে। এর কারণ নিয়ন্ত্রণ বর্হিভূত মাদকগ্রহণ সংশ্লিষ্ট সংকট, বিষণ্নতা, অতিমাত্রায় মাদক গ্রহণের কারণে সিদ্ধান্তহীনতা বা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারা, চিকিৎসার পরেও মাদকমুক্ত থাকতে ব্যর্থ হওয়া, পরিবারের অসহযোগিতা ও সন্দেহ, এবং মাদকাসক্তির কারণে অন্যান্য মানসিক সমস্যা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৭ লাখেরও বেশি মানুষ প্রতিবছর আত্মহত্যা করে মারা যাচ্ছে। ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হলো আত্মহত্যা। বিশ্বের মোট আত্মহত্যার ৬০ শতাংশ হয় এশিয়াতে। বিশ্বব্যাপী দেখা গেছে, ২ ভাবে মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে, আবেগপ্রবণ হয়ে এবং পরিকল্পনা করে।
সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আত্মহত্যা একটি জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় যে, আত্মহত্যার গড় হারে ২০১১ সালে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের ৩৮তম দেশ। কিন্তু মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে এই দেশ উঠে এসেছে ১০ নম্বর স্থানে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে আত্মহত্যা মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৬ জন, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাপত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সেটা দ্গুবিণের বেশি ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩২ জন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। কোভিড-১৯ এর সময় ১৪ হাজার আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং ২০২২ সালে ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।
বাংলাদেশে আত্মহত্যার কারণগুলো হচ্ছে, শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন, শারীরিক এবং মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক কলহ এবং সম্পর্কের বিচ্ছেদ, মাদকের অপব্যবহার, অর্থনৈতিক সমস্যা, পড়াশোনার চাপ, বেকারত্ব, পারিবারিক আত্মহত্যার ইতিহাস ইত্যাদি।
আত্নহত্যার ঝুঁকির লক্ষণগুলো হচ্ছে, মৌখিক হুমকি, ঘন ঘন মৃত্যু সংক্রান্ত ইচ্ছার কথা বলা, যখন দেখছেন আপনার সন্তান বা কাছের মানুষটি হঠাৎ করেই চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে, তার চেহারা, স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে উদাসীন বা ওজন খুব দ্রুত বাড়ছে বা কমছে, ফেইসবুক বা সোশাল মিডিয়াতে মৃত্যু নিয়ে বেশি পোস্ট বা ঘটনা দিচ্ছে, শরীরে অপ্রত্যাশিত আঘাতের চিহ্ন ইত্যাদি।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদের সভাপতিত্বে মূল আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রের মনোচিকিৎসক বিশেষজ্ঞ ডা. রাহেনুল ইসলাম। এছাড়াও প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা করেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র সাইক্লোজিস্ট রাখী গাঙ্গুলী ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপক ফারজানা ফেরদৌস।