নিজস্ব প্রতিবেদক :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে হ্যাঁ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং না ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। এতে হ্যাঁ ভোট জয়ী হয়েছে।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
আখতার আহমেদ বলেন, গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন, ফলে হ্যাঁ জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে, না ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।
আখতার আহমেদ বলেন, গনভোটে মোট ভোট পড়েছে ৭ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ৫৬টি। যা মোট ভোটের প্রায় ৬০ দশমিক ০৪ শতাংশ পড়েছে। এর মধ্যে হ্যাঁ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৭ ভোট। আর না ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোট।
জাতীয় নির্বাচনের থেকে গণভোটের হার বেশি কীভাবে হলো? এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, আপানার জানেন দুটি আসনের ভোট গ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু ফলাফল প্রকাশ হবে না। এ কারণে গণভোটের ক্ষেত্রে শতাংশটা বেড়ে গেছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার ফলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে যাচ্ছে।
গণভোটের রায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে যাওয়ায় বাংলাদেশের সংবিধানে বেশকিছু পরিবর্তন আসবে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী বিএনপি ও সমমনা ১২ দল এখন রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করবে। এসব দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করায় সনদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক সংস্কারের কিছু পরিবর্তন অবশ্যসম্ভাবী।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার পরিবর্তন
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হয়। জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী, সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে। কমিটিতে সরকারি দল, বিরোধী দল এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিও থাকবেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, কমিটি যাদের বাছাই করবে, তাদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী পদে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকতে পারবেন। এক ব্যক্তি একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধানের পদে থাকবেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা কমবে।
যদিও এক ব্যক্তির একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান না থাকার প্রস্তাবের ক্ষেত্রে বিএনপি আপত্তি তুলেছিল। তারা জুলাই সনদের আলোচনায় এ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। তাই, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার এ প্রস্তাব মানতে বাধ্য নয়।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সম্প্রসারণ
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতি মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন। এতে রাষ্ট্রপতির স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য আরো শক্ত হবে।
সংসদীয় কাঠামোর পুনর্বিন্যাস ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা
জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী, আগামী সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে। উচ্চ কক্ষ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠিত হবে। তবে, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চ কক্ষ গঠনের বিষয়ে আপত্তি আছে বিএনপির।
শেষ পর্যন্ত পিআর পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চ কক্ষ গঠন হলে কোনো একটি দলের একক আধিপত্য থাকা কঠিন হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে নিম্নকক্ষে দুই তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা বাড়ানো হয়েছে। অর্থবিল এবং আস্থা ভোট ছাড়া অন্য বিষয়ে তারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এছাড়া, চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের হাতে থাকবে।
সংবিধান সংশোধন ও গণভোটের প্রভাব
সংবিধান সংশোধনের জন্য তিনটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপ হলো— রাষ্ট্রপতির আদেশ, যা ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপ— গণভোট, যা জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বৈধতা যাচাই করবে। তৃতীয় ধাপে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবেন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রস্তাবিত সংস্কার সম্পন্ন করবেন।
গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থাকত না।
স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার ভারসাম্য
সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন, দুদক, মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো হবে।
গণঅভ্যুত্থান ও সংবিধান সংস্কারের প্রেক্ষাপট
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনার কথা ঘোষণা করে।
২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন খাতে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠিত হয়।
প্রাথমিকভাবে ১৬৬টি সুপারিশ চিহ্নিত করা হয়। এর পর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করে, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সম্পর্কিত। এগুলো জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যান্য সংস্কার
জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় সংসদে উচ্চ কক্ষ গঠন করা হবে। এছাড়া, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, নির্বাচনি এলাকার সীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি বাস্তবায়নের পথ খুলবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















