নিজস্ব প্রতিবেদক :
৪১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এতে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে জনপ্রত্যাশা বাস্তবায়নে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে তৈরি করা ইশতেহারে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর ‘জনতার ইশতেহার’-এর ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ইশতেহারে ১০টি বিষয়ে দলটি কী করবে আর কী করবে সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের’ ইশতেহার ঘোষণা করেন জামায়াতে আমির।
ইশতেহার ঘোষণার আগে ও পরে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনায় দলটির অঙ্গীকার তুলে ধরে দুটি ভিডিও উপস্থাপনা দেওয়া হয়। এতে নির্বাচনে জয়ী হলে দলটির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে অতিথিদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী নেতা, কূটনীতিক, জামায়াতের পেশাজীবী সমর্থকদের মধ্যে শিক্ষক, আইনজীবী ও চিকিৎসকরা উপস্থিত আছেন।
ইশতেহার ঘোষণার সময় তার এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ‘নারী বিদ্বেষী’ একটি পোস্টকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনার দিকে ইঙ্গিত করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আমি আহত পাখির মতো এখন। আমার উপর যেভাবে কয়েকদিন মিসাইল চলছে। আমি অ্যান্টি মিসাইল ব্যবহার করি নাই। যারা এটা করেছে আমি তাদের মাফ করে দিয়েছি। আমি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।“
সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার রক্ত ও মেজাজের সঙ্গে প্রতিশোধ যায় না। ভুলের জন্য আমি যদি ক্ষমা করতে না পারি, ক্ষমা চাইতে না পারি তাহলে আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইব কীভাবে?
“আমি প্রতিশোধের পথে হাঁটতে চাই না। তাহলে আমার উপর আরেকজনের প্রতিশোধ নেওয়া প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।”
জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে অতিথিরা।
জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে অতিথিরা।
নির্বাচনের আগে ঘরে বাইরে কোথাও শান্তি নাই মন্তব্য করে তিনি বলেন, চারিদিকে হাহাকার চলছে।
আগের সরকারের সময়কার লুটপাট ও অর্থপাচারের সমালোচনা করে তিনি দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন। তার দল সরকার পরিচালনার সুযোগ পেলে সবার জন্য ন্যয় ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তুলে ধরেন।
জামায়াত ক্ষমতায় এলে কী কী পরিবর্তন ঘটবে তা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “আমি আগেই বলেছি নির্বাচনে আমি জামায়াতের বিজয় চাই না, আমি চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।”
শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের দলের ইশতেহার তৈরিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মত দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকরা সহযোগিতা করেছেন।”
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ইশতেহারকে জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব, শৃঙ্খলাবান্ধব বলে দাবি করেন তিনি।
প্রবাসীদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াতের আমির। বলেন, “বেকার ভাতা নয়, বরং আমরা তোমাদের হাতে কাজ তুলে দেব।”
তিনি বলেন, “আমাদের এখানে চা বাগান থেকে উঠে আসা তরুণও প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, আমরা এমনভাবে গড়তে চাই।”
নারীদের কর্মঘণ্টা ও অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।
ইশতেহারকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে নয় জাতির প্রতি জীবন্ত দলিল হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি জনগণের কাছে জীবন্ত দলিল হিসেবে থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলো সমাজের প্রতি দায়বব্ধতা ও অঙ্গীকার থেকেই ইশতেহার দিয়ে থাকে।
১০ বিষয়ে ‘হ্যাঁ’-‘না’
ইশতেহারে ১০টি বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরে এসব ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হল-
>> দুর্নীতি – না
>> সততা – হ্যাঁ
>> ফ্যাসিবাদ – না
>> ঐক্য – হ্যাঁ
>> আধিপত্যবাদ – না
>> ইনসাফ – হ্যাঁ
>> বেকারত্ব – না
>> দক্ষতা – হ্যাঁ
>> চাঁদাবাজি – না
>> কর্মসংস্থান – হ্যাঁ
নির্বাচনি ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিবে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সেগুলো হলো-
১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।
২. বৈষমাহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আদেরকে প্রাধান্য দেয়া।
৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
৬. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।
৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন।
৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।
৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।
১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।
১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।
১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া।
১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি।
১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা।
১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।
১৯. আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।
২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা।
২২. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।
২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা।
২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা।
২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















