নিজস্ব প্রতিবেদক :
হামের বিস্তার রোধে ১৪ দিন এগিয়ে এনে আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে একযোগে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১১তম দিনের নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
টিকা ঘাটতির কথা স্বীকার করে জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ভ্যাকসিন ঘাটতি থাকলেও সরকার তা সামাল দিয়েছে; মজুত এখন স্থিতিশীল এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে।’
৫ এপ্রিল থেকে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এডিবির অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা পুনর্বিন্যাস করে নতুন টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সারা দেশে কর্মসূচি চালু করা হবে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মসূচি চালানো হবে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রুমিনের উদ্বেগের অনেকটাই যৌক্তিক, তবে সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।’
জনবল সংকটের প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে কর্মী সংকট থাকলেও মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানোর মতো সক্ষমতা রয়েছে। সরকার নতুন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের দিকেও যাচ্ছে।’
হামের প্রাদুর্ভাবের বর্ণনায় রুমি ফারহানা ঢাকাকে হটস্পট দাবি করলেও এ বিষয়ে আংশিক দ্বিমত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তালিকায় পুরো ঢাকা শহর নয়, ১৮ জেলার কিছু কিছু উপজেলা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব জেলার মধ্যে বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গাজীপুর, যশোর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর এবং ঢাকার নবাবগঞ্জ রয়েছে।’
টিকাদান কর্মসূচি এগিয়ে আনার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘ইউনিসেফ থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা সম্ভব হওয়ায় কর্মসূচি আগানো গেছে।’ টিকার মজুত এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে বলেও এ সময় সংসদকে আশ্বস্ত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
মন্ত্রী জানান, টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী কোল্ড চেইন বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সিঙ্গেল ডোজ ভায়াল থেকে মাল্টিডোজ ভায়ালে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সংরক্ষণ সহজ হয়। সরকারি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কোভিডকালীন এডিবির মহামারি তহবিলের অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা হাম-রুবেলাসহ জরুরি টিকা কেনার জন্য পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলেও সংসদকে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে ৪১৯ কোটি টাকার টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ২০০ কোটি টাকার চালান পাওয়া গেছে।
টেন্ডার না ডেকে সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘টেন্ডারের সময় লাগে, করাপশন হয়। এ কারণে আমরা ডাইরেক্ট ইউনিসেফের কাছ থেকে নিচ্ছি।’ সংসদে টিকা বিতরণের হিসাবও দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, উচ্চ সংক্রমণ এলাকাগুলোতে সর্বশেষ ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ডোজ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতি ভায়ালে ১০ ডোজ করে রয়েছে। আর হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের জন্য গ্যাভির মাধ্যমে সরকার মোট প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
সম্পূরক প্রশ্নে রুমিন ফারহানা বলেন, মন্ত্রী ‘অত্যন্ত সেনসিটিভ’ হয়ে গেছেন। মন্ত্রী রোগীকে ভয় না দেখানোর যে কথা বলেছেন, তার জবাবে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমি তো জানতাম আমি ৩০০ জন সংসদ সদস্যের সামনে কথা বলছি। ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে তো মাননীয় স্পিকার আমি কথা বলছি না।’
এরপর তিনি হামে শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৯৮টি শিশুর সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে, আর নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।
একই সঙ্গে একটি সংবাদপত্রের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘শুধু হাম নয়, ১০ রোগের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে; ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গুদামে কয়েকটি টিকার মজুত শূন্য, কিছু টিকার মজুত জুন পর্যন্ত চলবে।’
এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে ‘ক্রসচেক’ করা দরকার। তিনি বলেন, ‘আপনার মুখেই কিন্তু একটু কন্ট্রাডিক্টরি বলেছেন। একখানে ৯৮টা মৃত্যুর কথা বলেছেন, আবার নিশ্চিত মৃত্যুর কথা বলেছেন।’ মন্ত্রী দাবি করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ যৌথ সমীক্ষায় এ পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হামের কারণে নিশ্চিত হয়েছে।
আলোচনার একপর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের ওয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে প্রথম শিশুমৃত্যুর পর তিনি কেঁদেছিলেন। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ টিকার মজুত নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার শূন্য মজুত থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে শুরু করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের টিকার মজুত আমরা শূন্য থেকে শুরু করেছি।’
তবে এখন অর্থের সংস্থান হয়েছে, মন্ত্রিসভায় ৬০৪ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে এবং তা এডিবি হয়ে ইউনিসেফের কাছে যাবে বলেও সংসদকে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে সহায়তা করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘বিগত সময়ের ঘাটতি কাটিয়ে টিকার শক্ত মজুত গড়ে তোলার কাজ চলছে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















