নিজস্ব প্রতিবেদক :
২০২৫ সালে দেশজুড়ে ৬ হাজার ৭২৯ সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছে আর আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন। এরমধ্যে শুধু বাইকেই ২ হাজার ৪৯৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.০৪ শতাংশ। বাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৯৮৩ জনের এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ২১৯ জন।
রোববার (৪ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির ২০২৫ সালের বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বিদায়ী ২০২৫ সালে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত ও ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রেলপথে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত, ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। নৌ-পথে ১২৭টি দুর্ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত, ১৩৯ জন আহত এবং ৩৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত ও ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.০৪ শতাংশ, নিহতের ৩৮.৪৬ শতাংশ ও আহতের ১৪.৯৮ শতাংশ। সড়ক, রেল ও নৌ-পথে সর্বমোট ৭ হাজার ৩৬৯টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৭৫৪ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯৬ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়কে দুর্ঘটনা ৬.৯৪ শতাংশ, নিহত ৫.৭৯ শতাংশ এবং আহত ১৪.৮৭ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি আরো বলেন, দুর্ঘটনার ধরণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংগঠিত দুর্ঘটনার ৩৮.২২ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৭.১৩ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৮.৮৩ শতাংশ ফিডার রোডে সংগঠিত হয়েছে। এছাড়াও দেশে সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৪.২২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, ০.৬৮ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংগঠিত হয়েছে।
মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ক্ষমতার পালাবদল হলেও সড়কের নীতি পরিবর্তন না হওয়ায় সড়কে দুর্ঘটনা ও মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি আরো বেড়েছে। যানজট ও চাঁদাবাজির বৃদ্ধির কারণে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের ভাড়া আরেক দফা বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সড়ক পরিবহনখাত সংস্কার না করায় দেশের মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি, সড়কের নিরাপত্তা ও ভাড়া নৈরাজ্য পরিবহন মালিকদের ইচ্ছের বন্দি দশা থেকে মুক্তি মেলেনি।

‘এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এহেন ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা ও উন্নত গণপরিবহনের অঙ্গীকারের দাবি জানাচ্ছি।’
প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, সড়কের নির্মাণ ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য, চালকের অদক্ষতা, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, অরক্ষিত রেলক্রসিং, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে যেসব সুপারিশ তুলে ধরা হয় সেগুলো হলো-
১. প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবহনখাত সংস্কার সড়ক নিরাপত্তা, উন্নত গণপরিবহন ও যাত্রী অধিকারের বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত করা।
২. নির্বাচনী এলাকার অধিবাসীদের সড়ক নিরাপত্তা, যাতায়াতের ভোগান্তি লাঘবের বিষয়ে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্ন্তভুক্ত করা।
৩. সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বরাদ্ধ বাড়ানো, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক নিরাপত্তা উইং চালু করা।
৪. সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি নাগরিককে সরকারের ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে সহজে ও দ্রুততম সময়ে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।
৫. বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলে সরকার ঘোষিত ৬০ ঘণ্টার ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা।
৬. পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাদাঁবাজি বন্ধ করা।
৭. গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস প্রদান ও চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে উন্নত বিশ্বের কারিকুলাম চালু করা।
৮. ভয়াবহ ধুলাদূষণে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচাতে ঢাকনাবিহীন রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশার পরিবর্তে দেশের সব নগরীতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ইলেকট্রিক এসি বাসের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
৯. ট্রাফিক পুলিশের গতানুগতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
১০. সড়কে বৈধ যানবাহন ও অবৈধ যানবাহন চলাচলের জন্য আলাদা লেন প্রবর্তন করা।
১১. প্রতিটি জাতীয় মহাসড়কে ছোট ছোট যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন তৈরি করা।
১২. গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ তহবিলসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পক্ষে যাত্রী সাধারনের প্রতিনিধি অর্ন্তভুক্ত করা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























