নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে ১৮০ দিনের একটি কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হক।
সোমবার (২ মার্চ) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন।
শামসুল হক বলেন, প্রাথমিক এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হবে গণপরিবহনকে সুশৃঙ্খল করা এবং নারীদের জন্য নিরাপদ ও আবেদনসৃষ্টিকারী বাসসেবা চালু করা। নারীদের জন্য বিশেষায়িত বাস, যেখানে নারীচালক নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, তা দ্রুত চালুর বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় বিদ্যুৎচালিত বাস দিয়ে গণপরিবহনব্যবস্থার রূপান্তর শুরু করার কথাও গুরুত্ব পেয়েছে। ডিজেলচালিত বাসের পরিবর্তে ধাপে ধাপে ইলেকট্রিক বাস চালুর মাধ্যমে দূষণ কমানো এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বল্পসময়ে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শামসুল হক বলেন, বাসব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে জোনভিত্তিক পাইলট কার্যক্রম চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কম বিনিয়োগে বেশি মানুষের কভারেজ নিশ্চিত করা এবং মেট্রোরেলের পরিপূরক হিসেবে অন্যান্য গণপরিবহনব্যবস্থাকে সমন্বিত করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক (এআরআই) পরিচালক শামসুল হক বলেন, পূর্ব দিকের বাসাবো, গোরান, মাদারটেক, পুরানো টাউনে বিপুল জনগোষ্ঠী বাস করে। তারা কিন্তু ইভেন বাসও পায় না। মেট্রোগুলো সাধারণত প্রধান সড়কগুলোর ওপর দিয়ে গেছে। সো এটাকে যদি মেট্রোর বাইরে অন্য কোনো সংস্করণে আনা যায়— মেট্রো তো একটা না, আমরা একটা চিনেছি মেট্রো, কিন্তু ভারী মেট্রো। এটার যেমন দরকার আছে, ব্রডব্যান্ড কানেকশনের পাশাপাশি, কিন্তু লাইট রেলও দরকার আছে, মনোরেল দরকার আছে, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি দরকার আছে, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) দরকার আছে, এবং অর্ডিনারি বাস— সবকিছুই দরকার। কিন্তু, রেগুলেটেড হতে হবে। ঘিঞ্জি এলাকা যেখানে মেট্রো যাবে না, মেট্রোকে সাপ্লিমেন্ট করার জন্য আর কি করতে পারি, সেটার একটা স্টাডি করে উনাকে (প্রধানমন্ত্রী) একটা প্রস্তাব দেওয়া, যেন ওনারা এই বছর কাজ আরম্ভ করতে পারেন।
শামসুল হক বলেন, উনার আগ্রহ দেখলাম গণপরিবহনটাকে সুশৃঙ্খখল করা। এটা করতে গিয়ে যা যা করতে হয় মেট্রো মেট্রোর জায়গায় হবে কিন্তু এটা যেন সমন্বিতভাবে অন্যান্য মেট্রো সংস্করণগুলো আছে সেগুলোর সঙ্গে যেন সমন্বিত হয়।
তিনি আরও বলেন, উনি বলছেন, হ্যাঁ, আমাদের বাসগুলো অত্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল, বিশৃঙ্খল। এটাকে সুশৃঙ্খল করতে গেলে যা যা করণীয়, আরম্ভ করি না? আমরা পাইলটিং করে, জোন করে আরম্ভ করি। কম বিনিয়োগে বেশি মানুষকে কভারেজ দেওয়ার ব্যাপারে উনার আগ্রহ। আমি যখন বললাম— এটার জন্য উন্নয়ন যন্ত্রণাটা একটু কম হয়। আপনি স্টিলের যদি পিয়ার বানান, এইটাকে আপনি প্রিফ্যাব্রিকেটেড করে এখানে ইনস্টল করবেন— তাহলে এই ঘিঞ্জি এলাকায় উন্নয়নের পেইনটাও কম হবে। পুরো ঢাকার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় রেলভিত্তিক গণপরিবহনে যাওয়া যাবে। আর ঢাকাকে ডিসেন্ট্রালাইজ করার ব্যাপারেও কিন্তু উনার বড় একটা আগ্রহ দেখলাম— রেলভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে। উনি (প্রধানমন্ত্রী) বলছেন, হোয়াই নট— চিটাগং থেকে এখানে এসে অফিস করব কেন হবে না? আমরা দ্রুতগতির ট্রেন বানাতে যা যা করা লাগে, সেইভাবে করতে পারলে ঢাকার ওপর চাপটা আপনা-আপনি কমে যাবে’ বলেন বুয়েটের শিক্ষক শামসুল হক।
ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত এলাকায় গণপরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণে লাইট রেল ও মনোরেল চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগ্রহ প্রকাশ করেছেন জানিয়ে শামসুল হক বলেন, প্রায় আট-নয় মাস আগে তারেক রহমান নিজে থেকেই গণপরিবহন খাত সংস্কারের বিষয়ে আগ্রহ দেখান। তিনি দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থানকালে সেখানকার গণপরিবহনব্যবস্থা কাছ থেকে দেখেছেন এবং বাংলাদেশে জনগণবান্ধব একটি কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়টি তাকে ভাবাচ্ছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় মেট্রোরেল চালু হলেও পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তের অনেক ঘিঞ্জি ও অপরিকল্পিত এলাকায় এখনো গণপরিবহনের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। বাসাবো, গোড়ান, মাদারটেক ও পুরান ঢাকার মতো এলাকায় বিপুল জনগোষ্ঠী বাস করলেও তারা অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত বাসসুবিধাও পায় না। তাই মেট্রোরেলের পাশাপাশি লাইট রেল, মনোরেল, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও সাধারণ বাস—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
শামসুল হক বলেন, মেট্রোরেলের যে ছয়টি রুটের রূপরেখা রয়েছে, তা প্রধান সড়ক ধরে বিস্তৃত। তবে মেট্রোর বাইরে থাকা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিপূরক ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি সমীক্ষা করে প্রস্তাবনা দেওয়ার কথা হয়েছে, যাতে চলতি বছরেই কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া যায়।
তিনি বলেন, ঢাকার ওপর চাপ কমাতে রেলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে নগর বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দ্রুতগতির ট্রেন চালু করা গেলে চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে যাতায়াত সহজ হবে এবং রাজধানীর ওপর চাপ কমবে—এমন ভাবনাও রয়েছে।
শামসুল হক বলেন, আলোচনার ভিত্তিতে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার কথা হয়েছে। গণপরিবহনকে সমন্বিত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব রূপে গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 












