চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি :
ফরিদগঞ্জে হাঁস চুরির ঘটনা কেন্দ্র করে তুলকালামকাণ্ড ঘটে গেছে। চুরির ঘটনার বিচার হিসেবে নাকে খত দেওয়া ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করায় অপমানিত হয়ে মো. মাসুম (২০) নামে এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে দাবি করেছে তার পরিবার।
রোববার (৮ মার্চ) উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের চরমথুরা গ্রামের মিজিবাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। সংবাদ পেয়ে রাতেই পুলিশ লাশ উদ্ধার করেছে।
জানা গেছে, মিজিবাড়ির আলাউদ্দিন মিজির বড় ছেলে মাসুম (১৯) ও তার সঙ্গী পার্শ্ববর্তী পাটওয়ারীর বাড়ির নয়ন পাটওয়ারীর ২টি চীনা হাঁস ও ১টি দেশি হাঁস শুক্রবার (৬ মার্চ) রাতে চুরি করে। ওই রাতেই চুরি করা হাঁস তিনটি নয়ন পাটওয়ারীর চাচাতো বোন রাবেয়ার কাছে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করে।
এ ঘটনা শনিবার (৭ মার্চ) সকালে প্রকাশ হওয়ার পর অভিযুক্ত মাসুমের ঘরে এলাকার যুবকরা কয়েক দফা যায়। একপর্যায়ে ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান রোববার সকালে স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে সালিশ বৈঠক করেন।
চুরির ঘটনায় মাসুমকে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে ঘটনাস্থলে নাকে খত দেওয়া এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এ ঘটনার পর বিকালে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে মাসুম নিজের বসতঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
এদিকে স্থানীয় লোকজন জানান, মাসুমসহ বেশ কয়েকজন এলাকায় ছোটখাটো চুরির সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া এলাকায় একটি মাদক সিন্ডিকেট রয়েছে। আত্মহত্যার ঘটনা শুনে ঘটনাস্থলে গেলে দেখা যায় মাসুমের নিথর দেহ নিয়ে স্বজনদের আহাজারি। তারা চুরির ঘটনা কেন্দ্র করে এ করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। তাদের দাবি, হাঁস চুরির ঘটনা কেন্দ্র করে দফায় দফায় ঘরে হামলা, ভাঙচুর ও মাসুমকে মারধর করা হয়। সর্বশেষ রোববার বিচারের সময় মাসুম ও তার মাকে অপমানজনক কথা বলা হয়। মাসুমকে সবার সামনে নাকে খত দিতে বাধ্য করা হয়। তাই সে অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে।
মাসুমের মা মৌসুমী জানান, তার বড় ছেলে মাসুম তিনটি হাঁস চুরি করেছে। এ চুরির ঘটনা কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েক দফা এলাকার ছেলেরা তার ছেলেকে শাসিয়ে যায় এবং মারধর করে। রোববার সকালে স্থানীয় মিজান মেম্বারের নেতৃত্বে বিচার হয়। বিচারে তার ছেলেকে দোষী করে নাকে খত দেওয়া এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করে। এ সময়ে আমাকে ও আমার ছেলেকে নানা কথায় অপমান করে তারা। বিচার শেষে বিকাল ৩টার দিকে আমি মাদ্রাসায় যাই। সেখানে যাওয়ার পর ৪টার দিকে সংবাদ পাই যে আমার ছেলে অপমান সহ্য করতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়েছে। এ ছাড়া চুরির ঘটনা কেন্দ্র করে আমার ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে।
মাসুমের খালা সুমি বেগম বলেন, আমার বোনের ছেলের মৃত্যুর ঘটনার বিচার চাই। তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে।
সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল গনি জানান, আমি এ বাড়ির অভিভাবক। এলাকার চুরির ঘটনা কেন্দ্র করে বিচার হয়েছে। অথচ আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। বিচার যথাযথ হয়েছে কিনা তা আমি নিশ্চিত নই। তবে এ মৃত্যুটি মেনে নেওয়া যায় না।
পাটওয়ারীবাড়ির নয়ন পাটওয়ারী জানান, শুক্রবার রাতে তাদের ঘর থেকে তিনটি হাঁস চুরি হয়। পর দিন সকালে জানতে পারি আমার চাচাতো বোন রাবেয়ার কাছে মাসুম ও আল আমিন ১৪০০ টাকায় তিনটি হাঁস বিক্রি করেছে। এরপর আমরা তার বাড়িতে যাই। কিন্তু সে খারাপ আচারণ করে। পরবর্তীতে ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানকে জানালে তিনি বিচারের ব্যবস্থা করেন ।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, হাঁস চুরির ঘটনা জেনে আমি এলাকার লোকজন নিয়ে বিচারে বসি। বিচারে তাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং চুরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য নাকে খত দিতে বলি। জরিমানার টাকা সে আয়-রোজগার করে দেবে। সন্ধ্যার দিকে শুনতে পাই, সে নিজের ঘরে আত্মহত্যা করেছে। ঘটনা পুলিশকে জানিয়েছি। সংবাদ পেয়ে পুলিশ রাতেই লাশ উদ্ধার করছে।
ফরিদগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক মো. হেলালউদ্দিন বলেছেন, মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি 






















