Dhaka রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
খসড়া মহাপরিকল্পনা

সেন্টমার্টিনের ৪ কিলোমিটার এলাকায় ঘুরতে পারবেন পর্যটকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন চালু করতে চায় সরকার। সেন্ট মার্টিন সংরক্ষণে করা খসড়া মহাপরিকল্পনায় এ দ্বীপের চার কিলোমিটারের মধ্যে পর্যটকদের চলাচল সীমিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে ২০২৫ সালে পর্যটকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করার আগে এ দ্বীপে আগে ৭ হাজার ১৯৩ পর্যটক রাত যাপন করতেন। মহাপরিকল্পনা বলছে, এটি সেন্ট মার্টিনের ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ। এর ফলে প্রবাল সংগ্রহ, নৌযানের দূষণ ও সমুদ্রসৈকতে আবর্জনার পরিমাণ বেড়েছে। এতে প্রবাল পড়েছে অস্তিত্বের হুমকিতে।

২০২০ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কাউসার আহাম্মদ, ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষক মো. ইউসুফ গাজী ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী তাহরিমা জান্নাতের এক গবেষণায় উঠে আসে, ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩৮ বছরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রবাল প্রজাতি ১৪১টি থেকে কমে ৪০টিতে দাঁড়ায়। ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক ওশান সায়েন্স জার্নালে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে।

মহাপরিকল্পনায় সংরক্ষণের অংশ হিসেবে আট বর্গকিলোমিটারের সেন্ট মার্টিনকে চারটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম জোনকে নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাধারণ ব্যবহার এলাকা’। সেন্ট মার্টিনের অন্য তিন অংশ থেকে হোটেল ও রিসোর্ট সরিয়ে এ জোনে নিয়ে আসা হবে। এ জোনেই রাত কাটাবেন পর্যটকেরা। প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এখানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ পর্যটক সংখ্যা ৯০০ জনে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে মহাপরিকল্পনায়।

সাতটি পাড়া নিয়ে গঠিত হবে জোন-১। এটি পর্যটক, অবকাঠামো ও সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও সৈকতে যানবাহন চালানো, রাতে আলো জ্বালানো, প্রবাল সংগ্রহ ও দূষণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

জোন–২ হবে নিয়ন্ত্রিত সম্পদ এলাকা। এ এলাকাটি দক্ষিণ অংশের সংবেদনশীল এলাকার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় বাফার জোন হিসেবে কাজ করবে। এই এলাকায় পর্যটন অবকাঠামো, কৃষিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ হবে। সৈকতে আগুন জ্বালানো ও রান্নাবান্নাও নিষিদ্ধ থাকবে এই এলাকায়।

জোন-৩-কে ঘোষণা করা হবে টেকসই ব্যবস্থাপনা অঞ্চল হিসেবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এই এলাকাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এখানে বসতি স্থাপন, অবকাঠামো নির্মাণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়, এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে। এই এলাকার ম্যানগ্রোভ, ল্যাগুন (ছোট জলাধার) ও কচ্ছপের প্রজনন স্থান বিশেষ সুরক্ষার আওতায় আসবে।

ছেঁড়াদিয়া দ্বীপের অংশ নিয়ে হবে জোন-৪। এই এলাকায় অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। এই জোনের এক কিলোমিটারের মধ্যে মাছ ধরা, দূষণ ও বন্য প্রাণীকে বিরক্ত করা নিষিদ্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতি পাঁচ বছর পরপর দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে বলে পরামর্শ এসেছে মহাপরিকল্পনায়।

এ মহাপরিকল্পনা তৈরিতে যুক্ত ছিলেন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইস)-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক এইচ এম নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ জোনিং করা হয়েছে সেন্ট মার্টিনের ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে। জোন-১-এ সব হোটেল ও রিসোর্ট থাকবে। অন্য তিন অংশে যে হোটেল ও রিসোর্ট আছে, সেগুলোকে জোন-১-এ নিয়ে আসা হবে। প্রয়োজনে সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে ক্ষতিগ্রস্ত হোটেল ও রিসোর্টের মালিকদের।

এইচ এম নুরুল ইসলাম বলেন, পর্যটকেরা অন্য তিন জোনে দিনে ঘোরাঘুরি করতে পারবেন। কিন্তু রাত যাপন করতে পারবেন না। রাত যাপন করতে হবে জোন–১–এ। এ ছাড়া জোন–৪–এ আছে ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ। সেখানে পর্যটকেরা ৫০০ থেকে ১০০০ মিটার দূরত্ব থেকে এ দ্বীপ দেখবেন, কিন্তু দ্বীপে অবতরণ করা যাবে না।

এই মহাপরিকল্পনা ১০ বছর মেয়াদি। প্রথম পাঁচ বছর ধরে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। পরবর্তী পাঁচ বছর বাস্তবায়িত পদক্ষেপগুলোর পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হবে।

স্থানীয় লোকজনের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান

খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সেন্ট মার্টিনে বসবাস করে মোট ১ হাজার ৪৪৫টি পরিবার। জনসংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৫। প্রতি পরিবারে সদস্যসংখ্যা গড়ে ৬ দশমিক ৮৪। মোট জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশের বয়স ১৯ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। তাদের আয়ের দুটি মাত্র উৎস—একটি পর্যটন ও অন্যটি মাছ ধরা। এসব পরিবারের মোট আয়ের ৬১ শতাংশ আসে মাছ ধরা এবং ৩১ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। মাসিক গড় আয় ৬ হাজার ৪৪৮ টাকা। দ্বীপের ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।

পর্যটন ব্যবসা ও মাছ ধরা নিয়ন্ত্রিত হলে এসব পরিবারের আয়ের উৎসে প্রভাব পড়বে। অক্টোবর থেকে মার্চ এ সময়টা পর্যটন মৌসুম। এ দ্বীপে হোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা ১০৯।

জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করতে হলে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কোনো বিকল্প নেই। এখানে পর্যটন হতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক। এ ছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থানে মৎস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্প হাতে নেবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব জলবায়ু তহবিল থেকে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

পাল্টে গেছে দ্বীপের ভূমির ব্যবহার

মহাপরিকল্পনায় তথ্য দেওয়া হয়েছে, হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় সেন্ট মার্টিনে গত ১৮ বছরে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা কমেছে ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। কৃষিজমি কমেছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০৫ সালের দিকে পর্যটন অবকাঠামো ছিল ৪৫ দশমিক ২৬ হেক্টর জমির ওপর। ২০২৩ সাল নাগাদ তা দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ১৩ হেক্টরে। এ সময়ে ম্যানগ্রোভ বন কমেছে ৩ শতাংশ। ধীরে ধীরে কৃষিজমির রূপান্তর হচ্ছে। দ্বীপের এ রূপান্তর পরিবেশগত একটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে উল্লেখ করে মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এ রূপান্তর বন্ধ করতে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

২০২০ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গবেষণায় বলা হয়, সেন্ট মার্টিনে ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা সাড়ে চার বর্গকিলোমিটার থেকে কমে নেমেছে তিন বর্গকিলোমিটারে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সেন্ট মার্টিনে জমি ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। জমি হস্তান্তর কোন উদ্দেশ্যে হবে, সেটা জেলা প্রশাসন থেকে উল্লেখ থাকতে হবে। এটা না হলে বহিরাগতরা গিয়ে জমি কিনে স্থানীয় লোকজনের ওপর ছড়ি ঘোরাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফিক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, মাস্টারপ্ল্যান করা হয় অনেক চিন্তাভাবনা করে দীর্ঘ মেয়াদে ফল পাওয়ার জন্য। সেন্ট মার্টিনের মতো পৃথিবীতে যত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা আছে, সেগুলোর সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও জাতিসংঘের নির্দেশনা আছে। বিভিন্ন দেশে এ ধরনের অঞ্চলগুলোকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।

মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতের লাকসার দ্বীপে পর্যটক নিষিদ্ধ। কারণ, তারা সংরক্ষণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করতে গেলে সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সব পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করলে মাস্টারপ্ল্যানের যে অভীষ্ট লক্ষ্য, সেটা অর্জন করা সহজ হবে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

মুন্সীগঞ্জে-৩ : স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিনের মনোনয়নপত্র বৈধ

খসড়া মহাপরিকল্পনা

সেন্টমার্টিনের ৪ কিলোমিটার এলাকায় ঘুরতে পারবেন পর্যটকরা

প্রকাশের সময় : ০৩:২৮:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন চালু করতে চায় সরকার। সেন্ট মার্টিন সংরক্ষণে করা খসড়া মহাপরিকল্পনায় এ দ্বীপের চার কিলোমিটারের মধ্যে পর্যটকদের চলাচল সীমিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে ২০২৫ সালে পর্যটকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করার আগে এ দ্বীপে আগে ৭ হাজার ১৯৩ পর্যটক রাত যাপন করতেন। মহাপরিকল্পনা বলছে, এটি সেন্ট মার্টিনের ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ। এর ফলে প্রবাল সংগ্রহ, নৌযানের দূষণ ও সমুদ্রসৈকতে আবর্জনার পরিমাণ বেড়েছে। এতে প্রবাল পড়েছে অস্তিত্বের হুমকিতে।

২০২০ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কাউসার আহাম্মদ, ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষক মো. ইউসুফ গাজী ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী তাহরিমা জান্নাতের এক গবেষণায় উঠে আসে, ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩৮ বছরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রবাল প্রজাতি ১৪১টি থেকে কমে ৪০টিতে দাঁড়ায়। ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক ওশান সায়েন্স জার্নালে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে।

মহাপরিকল্পনায় সংরক্ষণের অংশ হিসেবে আট বর্গকিলোমিটারের সেন্ট মার্টিনকে চারটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম জোনকে নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাধারণ ব্যবহার এলাকা’। সেন্ট মার্টিনের অন্য তিন অংশ থেকে হোটেল ও রিসোর্ট সরিয়ে এ জোনে নিয়ে আসা হবে। এ জোনেই রাত কাটাবেন পর্যটকেরা। প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এখানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ পর্যটক সংখ্যা ৯০০ জনে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে মহাপরিকল্পনায়।

সাতটি পাড়া নিয়ে গঠিত হবে জোন-১। এটি পর্যটক, অবকাঠামো ও সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও সৈকতে যানবাহন চালানো, রাতে আলো জ্বালানো, প্রবাল সংগ্রহ ও দূষণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

জোন–২ হবে নিয়ন্ত্রিত সম্পদ এলাকা। এ এলাকাটি দক্ষিণ অংশের সংবেদনশীল এলাকার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় বাফার জোন হিসেবে কাজ করবে। এই এলাকায় পর্যটন অবকাঠামো, কৃষিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ হবে। সৈকতে আগুন জ্বালানো ও রান্নাবান্নাও নিষিদ্ধ থাকবে এই এলাকায়।

জোন-৩-কে ঘোষণা করা হবে টেকসই ব্যবস্থাপনা অঞ্চল হিসেবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এই এলাকাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এখানে বসতি স্থাপন, অবকাঠামো নির্মাণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়, এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে। এই এলাকার ম্যানগ্রোভ, ল্যাগুন (ছোট জলাধার) ও কচ্ছপের প্রজনন স্থান বিশেষ সুরক্ষার আওতায় আসবে।

ছেঁড়াদিয়া দ্বীপের অংশ নিয়ে হবে জোন-৪। এই এলাকায় অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। এই জোনের এক কিলোমিটারের মধ্যে মাছ ধরা, দূষণ ও বন্য প্রাণীকে বিরক্ত করা নিষিদ্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতি পাঁচ বছর পরপর দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে বলে পরামর্শ এসেছে মহাপরিকল্পনায়।

এ মহাপরিকল্পনা তৈরিতে যুক্ত ছিলেন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইস)-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক এইচ এম নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ জোনিং করা হয়েছে সেন্ট মার্টিনের ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে। জোন-১-এ সব হোটেল ও রিসোর্ট থাকবে। অন্য তিন অংশে যে হোটেল ও রিসোর্ট আছে, সেগুলোকে জোন-১-এ নিয়ে আসা হবে। প্রয়োজনে সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে ক্ষতিগ্রস্ত হোটেল ও রিসোর্টের মালিকদের।

এইচ এম নুরুল ইসলাম বলেন, পর্যটকেরা অন্য তিন জোনে দিনে ঘোরাঘুরি করতে পারবেন। কিন্তু রাত যাপন করতে পারবেন না। রাত যাপন করতে হবে জোন–১–এ। এ ছাড়া জোন–৪–এ আছে ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ। সেখানে পর্যটকেরা ৫০০ থেকে ১০০০ মিটার দূরত্ব থেকে এ দ্বীপ দেখবেন, কিন্তু দ্বীপে অবতরণ করা যাবে না।

এই মহাপরিকল্পনা ১০ বছর মেয়াদি। প্রথম পাঁচ বছর ধরে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। পরবর্তী পাঁচ বছর বাস্তবায়িত পদক্ষেপগুলোর পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হবে।

স্থানীয় লোকজনের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান

খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সেন্ট মার্টিনে বসবাস করে মোট ১ হাজার ৪৪৫টি পরিবার। জনসংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৫। প্রতি পরিবারে সদস্যসংখ্যা গড়ে ৬ দশমিক ৮৪। মোট জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশের বয়স ১৯ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। তাদের আয়ের দুটি মাত্র উৎস—একটি পর্যটন ও অন্যটি মাছ ধরা। এসব পরিবারের মোট আয়ের ৬১ শতাংশ আসে মাছ ধরা এবং ৩১ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। মাসিক গড় আয় ৬ হাজার ৪৪৮ টাকা। দ্বীপের ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।

পর্যটন ব্যবসা ও মাছ ধরা নিয়ন্ত্রিত হলে এসব পরিবারের আয়ের উৎসে প্রভাব পড়বে। অক্টোবর থেকে মার্চ এ সময়টা পর্যটন মৌসুম। এ দ্বীপে হোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা ১০৯।

জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করতে হলে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কোনো বিকল্প নেই। এখানে পর্যটন হতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক। এ ছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থানে মৎস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্প হাতে নেবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব জলবায়ু তহবিল থেকে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

পাল্টে গেছে দ্বীপের ভূমির ব্যবহার

মহাপরিকল্পনায় তথ্য দেওয়া হয়েছে, হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় সেন্ট মার্টিনে গত ১৮ বছরে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা কমেছে ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। কৃষিজমি কমেছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০৫ সালের দিকে পর্যটন অবকাঠামো ছিল ৪৫ দশমিক ২৬ হেক্টর জমির ওপর। ২০২৩ সাল নাগাদ তা দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ১৩ হেক্টরে। এ সময়ে ম্যানগ্রোভ বন কমেছে ৩ শতাংশ। ধীরে ধীরে কৃষিজমির রূপান্তর হচ্ছে। দ্বীপের এ রূপান্তর পরিবেশগত একটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে উল্লেখ করে মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এ রূপান্তর বন্ধ করতে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

২০২০ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গবেষণায় বলা হয়, সেন্ট মার্টিনে ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা সাড়ে চার বর্গকিলোমিটার থেকে কমে নেমেছে তিন বর্গকিলোমিটারে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সেন্ট মার্টিনে জমি ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। জমি হস্তান্তর কোন উদ্দেশ্যে হবে, সেটা জেলা প্রশাসন থেকে উল্লেখ থাকতে হবে। এটা না হলে বহিরাগতরা গিয়ে জমি কিনে স্থানীয় লোকজনের ওপর ছড়ি ঘোরাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফিক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, মাস্টারপ্ল্যান করা হয় অনেক চিন্তাভাবনা করে দীর্ঘ মেয়াদে ফল পাওয়ার জন্য। সেন্ট মার্টিনের মতো পৃথিবীতে যত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা আছে, সেগুলোর সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও জাতিসংঘের নির্দেশনা আছে। বিভিন্ন দেশে এ ধরনের অঞ্চলগুলোকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।

মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতের লাকসার দ্বীপে পর্যটক নিষিদ্ধ। কারণ, তারা সংরক্ষণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করতে গেলে সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সব পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করলে মাস্টারপ্ল্যানের যে অভীষ্ট লক্ষ্য, সেটা অর্জন করা সহজ হবে।