স্পোর্টস ডেস্ক :
বাংলাদেশে ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম পদত্যাগ না করা পর্যন্ত সব ধরনের ক্রিকেট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানী বনানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয় কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন।
মোহাম্মদ মিঠুন বলেন, ‘মাঠে যাবো একটাই শর্তে, বিসিবি থেকে এসে যদি কমিটমেন্ট করে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই লোক বিসিবিতে থাকবে না। যদি থাকে, তাহলে খেলা বন্ধের দায় ক্রিকেটাররা নেবে না। যদি বিসিবি থেকে অফিশিয়াল ডিক্লেয়ার করে।
মিঠুন বলেন, ক্রিকেটাররা খেলতে চায়, কিন্তু সম্মান ও ন্যূনতম সীমার প্রশ্নে কোনো আপস সম্ভব নয়। তার ভাষায়, তারা খেলার বিপক্ষে নন, তবে সবকিছুরই একটি সীমা রয়েছে, আর সেই সীমা বহু আগেই অতিক্রম করা হয়েছে।
এই ইস্যু কেবল একজন ক্রিকেটার বা একটি সংগঠনের নয়, বরং পুরো ক্রিকেট অঙ্গনের সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্ন বলে জানান মিঠুন। তার মতে, বিসিবি পরিচালকের বক্তব্যে ক্রিকেটের প্রতিটি স্তরকেই অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এমনকি আইসিসি ট্রফি জয় থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের গুরুত্বও কার্যত অস্বীকার করা হয়েছে বলেই মনে করছেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংশ্লিষ্ট পরিচালকের কথাবার্তায় ক্রিকেটের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা তারা দেখতে পাননি।
মিঠুন বলেন, ‘আমার এখনও ওই স্ট্যান্ডেই আছি। যেটা সোহান বলেছে আমরা খেলার বিপক্ষে না। সবকিছুর একটা লিমিট আছে। লিমিট ক্রস করে গেলে… এখানে এটা শুধু আমার না এখানে টোটাল ক্রিকেট অঙ্গনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সবাইকে অপমান করা হয়েছে। উনি আইসিসি ট্রফি জেতা থেকে শুরুন করে প্রতিটি সেক্টরকে অস্বীকার করেছে।’
‘উনার কাছে বিশ্বকাপও কোনো মানে রাখে না। উনার কোনো কথাতে ক্রিকেটের প্রতি শ্রদ্ধা বিন্দু মাত্র দেখিনি। আমার আগের অবস্থানেই অনড় আছি। আমার বিভিন্নভাবে বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করেছি। উনারা আমাদের খেলার জন্য এপ্রোচ করছেন, আমরা অবশ্যই খেলতে চাই, তবে আমাদের দাবিগুলো মানার পরে,’ যোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে কোয়াব সভাপতি বলেন, বোর্ডের সঙ্গে তারা বারবার আলোচনার চেষ্টা করেছেন। বিসিবির পক্ষ থেকে খেলা চালু রাখার জন্য যোগাযোগ করা হলেও, ক্রিকেটাররা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন, দাবিগুলো মানা না হলে মাঠে ফেরার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের মতো এবারও বোর্ড সময় নেওয়ার কৌশল নিচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান আসছে না।
মিঠুনের ভাষায়, ‘উনারা দাবি না মেনে আগের ৮-১০টা টপিকসের মতো টাইম নিয়েছে, টাইম নিয়েছে, তারপর সেটার হদিস নাই। এখনও সেই কাজটাই করতে চাইছে। আপনারা আজকের স্ট্যান্ড দেখছেন। কিন্তু আমাদের এই স্ট্যান্ড আজকের না, এটা আসলে অনেক দিনের অবজারভেশন।’
তাদের মতে, এই অবস্থান হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। এটি কোনো এক দিনের প্রতিক্রিয়াও নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেটারদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। শুরুতে তারা চেয়েছিলেন বিষয়টি নীরবে, সম্মানের সঙ্গে এবং ক্লোজ ডোর আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে। কারণ বিসিবিতে অনেক সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রিকেট ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ রয়েছেন, যাদের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখাটাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
‘আমরাও চেয়েছিলাম বিসিবিতে যে পরিচালকগুলো আছেন, সবাইকে সম্মান দিয়ে কীভাবে ক্লোজ ডোরে কীভাবে আলোচনা করতে পারি। কারণ ঐখানে আমাদের ক্রিকেটিং ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেক মানুষ। অনেক ক্রিকেট প্লেয়ার আছে। আমরা চাইনা ক্রিকেট প্লেয়ারগুলো অসম্মানিত হোক। উনাদের কথা চিন্তা করে আমরা চেয়েছিলাম, সবকিছু যেন সাইলেন্টলি, সুন্দরভাবে রান করে। কিন্তু আপনারাও দেখতে পাচ্ছেন এই ধরণের কিছুই হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত আমাদের আসলেই কোনো ওয়ে নাই। বিসিবি থেকে যদি সুষ্ঠু সমাধান হয়, তাহলে অবশ্যই আমরা মাঠে নামব,’ বলেন মিঠুন।
তবে পরিস্থিতি যেভাবে গড়িয়েছে, তাতে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই বলেই মন্তব্য করেন কোয়াব সভাপতি। তার মতে, ক্রিকেটাররা কখনোই চান না খেলোয়াড়দের অপমানিত হতে দেখা যাক, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।
শেষ পর্যন্ত মিঠুন আবারও পরিষ্কার করে দেন, বল এখন বিসিবির কোর্টেই। বিসিবি যদি একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক সমাধান দিতে পারে, তাহলে ক্রিকেটাররা অবশ্যই মাঠে নামবেন। কিন্তু তার আগে কোনো খেলা নয়, এই সিদ্ধান্তেই তারা অনড়।
এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি ও বিপিএল বয়কটের সিদ্ধান্ত ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ সবচেয়ে স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। বোর্ড পরিচালকের মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় বলি বোর্ড আমাদের অভিভাবক। তারা এমন মন্তব্য করলে আমাদের জন্য দুঃখজনক।’
ক্রিকেটারদের আয় ও বোর্ডের অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রচলিত ধারণার কড়া সমালোচনা করেন মিরাজ। তিনি বলেন, ‘জিনিসটা আসলে এরকম না।’ এরপর ব্যাখ্যা করে তিনি যোগ করেন, ‘আমরা যে টাকা আয় করি, বেশিরভাগ আইসিসি ও স্পন্সর থেকেই আসে। আজ বিসিবির যে টাকা আছে, বাংলাদেশের জার্সি পরে একটা ম্যাচও যে খেলেছে তারও এখানে অংশ আছে। প্রতিটি মানুষের কষ্টের বিনিময়ে আজকের বোর্ডের টাকা। এতে প্রত্যেক মানুষের হক আছে।’
মাঠে ক্রিকেট না হলে বোর্ডের অবস্থানও টেকসই হবে না, এ কথাও স্পষ্ট করে বলেন ওয়ানডে অধিনায়ক। তার ভাষায়, ‘মাঠে খেলা হচ্ছে বলেই বোর্ড ভালো জায়গায় আছে। খেলাই যদি না হয়, স্পন্সরও আসবে না, আইসিসি থেকে লভ্যাংশও আসবে না।’
নাজমুল ইসলামের মন্তব্যকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মনে করেন মিরাজ। তিনি বলেন, ‘এটা শুধু ব্যক্তিগত না। ক্রীড়াঙ্গনের জন্যই এটা লজ্জাজনক। উনি যে মন্তব্য করেছেন জানি না কীভাবে করেছেন বুঝে নাকি না বুঝে, আমার কাছে এটার ব্যাখ্যা নাই। তিনিই এটা ভালো জানেন। তার জায়গা থেকে এমন মন্তব্য করা ঠিক না। দায়িত্বে থেকে এমন মন্তব্য করা উচিত না।’
সমালোচনা প্রসঙ্গে মিরাজ বাস্তবতার কথাও স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় চেষ্টা করি ভালো খেলার জন্য। আমরা সবসময় সমালোচিত হই। পারফর্ম না করলে এমন খেলোয়াড় নেই, যার সমালোচনা হয়নি।’
সরকারি অর্থ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার জবাব দিতেও পিছপা হননি তিনি। মিরাজ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘অনেকের ধারণা সরকার থেকে আমরা টাকা পাই। না, আমরা মাঠে খেলেই সম্পূর্ণ টাকা পাই।’ পাশাপাশি আয়করের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যে আয় করি, আমরাই সবচেয়ে বেশি আয়কর দেই, ২৫-৩০ শতাংশ সরকারকে টাকা দেই।’
স্পোর্টস ডেস্ক 






















