Dhaka শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সংযোগ সড়ক না থাকায় কাজে আসছে না প্রায় ১০ কোটি টাকা সেতু

গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি : 

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিঙ্গুয়া বাজার ও নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার আছাদনগড়ের সংযোগস্থলে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও চার বছরে নির্মিত হয়নি সংযোগ সড়ক। সেতুর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় পুরো প্রকল্পটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যা রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের এক প্রকট উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর ৯৬ মিটার দীর্ঘ পি.এস.সি গার্ডার সেতুটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় অনুমোদন পায়। তবে প্রকল্প অনুমোদনের সময় সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণ, রাস্তার নকশা ও বাস্তবায়ন প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হয়নি বলে জানা গেছে। প্রকল্প নথিতে সেতু নির্মাণের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও সংযোগ সড়কের বিষয়টি ছিল অস্পষ্ট। ফলে সেতুর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে গেলেও বাস্তবে সেতু ব্যবহারের উপযোগী করা হয়নি। ২০২২ সালের ৭ মার্চ কার্যাদেশ জারি হয়। কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের ১২ মার্চ।

নির্ধারিত সময় পার হলেও সংযোগ সড়কের কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও প্রকল্প তদারকির দুর্বলতার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি। সেতু চালু না হওয়ায় কাপাসিয়া ও মনোহরদীর হাজারো মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান কিংবা দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থী, রোগী ও কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে।

স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ আলী বলেন, চার বছর ধরে শুধু আশ্বাস পাচ্ছি। ব্রিজ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু রাস্তা নেই। বর্ষায় স্কুলগামী শিশু, রোগী—সবাই ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছে, কিন্তু রাস্তা হচ্ছে না। সড়ক নির্মাণ না করা হলে এই সেতু নির্মাণে মানুষের কোনো উপকার হবেনা।

সিঙ্গুয়া বাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতিদিন শত শত মানুষ বিকল্প পথে কিংবা নৌকায় পারাপার হচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে। নদীর ওই পার থেকে মানুষ এসে এখনে ব্যবসা করে এবং বাজার করেন। ব্রিজটি কোনো কাজে আসছে না। মালামাল পরিবহনে তাদের বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হচ্ছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

তারা প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

স্থানীয় শিক্ষক জসিম উদ্দিন বলেন, এই সেতু চালু হলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসত। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

শিক্ষক ওমর ফারুক জানান, গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিঙ্গুয়ার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার সুবাদে এই ব্রিজ দিয়ে তার নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়। এছাড়া বহু ছাত্র-ছাত্রী নদী পথেই যাতায়াত করে প্রতিষ্ঠানে আসে। সেতু নির্মাণ হলেও দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় বর্ষা মৌসুমে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলার বিষয়টি শুরুতেই সমাধান না করেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর সময় বাড়ানোই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

তারা আরও বলেন, সংযোগ সড়ক নিশ্চিত না করে সেতু নির্মাণ করা ঠিক হয়নি, আগে সংযোগ সড়ক নির্মাণ জরুরি ছিলো।

মনোহরদী উপজেলা প্রকৌশলী হরষিত কুমার সাহা বলেন, ৯৬ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি পি.এস.সি গার্ডার সেতুর কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২২ সালের ৭ মার্চ কার্যাদেশ জারি হয় এবং নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের ১২ মার্চ পর্যন্ত। বিশেষ অবস্থানগত জটিলতার কারণে কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত সময়সীমা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তবে সংশোধিত সময়সীমা কবে কার্যকর হবে বা কবে সেতু চালু হবে, সেবিষয়ে স্পষ্ট কোনো আশ্বাস দেননি তিনি।

এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত দুই পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণ শেষ করে সেতুটি জনসাধারণের জন্য খুলে দিতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নচেৎ সরকারের ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু অচল অবস্থায় পড়ে থেকে ‘উন্নয়নের নামে অপচয়’-এর আরেকটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

সংযোগ সড়ক না থাকায় কাজে আসছে না প্রায় ১০ কোটি টাকা সেতু

প্রকাশের সময় : ১০:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি : 

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিঙ্গুয়া বাজার ও নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার আছাদনগড়ের সংযোগস্থলে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও চার বছরে নির্মিত হয়নি সংযোগ সড়ক। সেতুর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় পুরো প্রকল্পটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যা রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের এক প্রকট উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর ৯৬ মিটার দীর্ঘ পি.এস.সি গার্ডার সেতুটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় অনুমোদন পায়। তবে প্রকল্প অনুমোদনের সময় সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণ, রাস্তার নকশা ও বাস্তবায়ন প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হয়নি বলে জানা গেছে। প্রকল্প নথিতে সেতু নির্মাণের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও সংযোগ সড়কের বিষয়টি ছিল অস্পষ্ট। ফলে সেতুর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে গেলেও বাস্তবে সেতু ব্যবহারের উপযোগী করা হয়নি। ২০২২ সালের ৭ মার্চ কার্যাদেশ জারি হয়। কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের ১২ মার্চ।

নির্ধারিত সময় পার হলেও সংযোগ সড়কের কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও প্রকল্প তদারকির দুর্বলতার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি। সেতু চালু না হওয়ায় কাপাসিয়া ও মনোহরদীর হাজারো মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান কিংবা দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থী, রোগী ও কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে।

স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ আলী বলেন, চার বছর ধরে শুধু আশ্বাস পাচ্ছি। ব্রিজ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু রাস্তা নেই। বর্ষায় স্কুলগামী শিশু, রোগী—সবাই ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছে, কিন্তু রাস্তা হচ্ছে না। সড়ক নির্মাণ না করা হলে এই সেতু নির্মাণে মানুষের কোনো উপকার হবেনা।

সিঙ্গুয়া বাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতিদিন শত শত মানুষ বিকল্প পথে কিংবা নৌকায় পারাপার হচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে। নদীর ওই পার থেকে মানুষ এসে এখনে ব্যবসা করে এবং বাজার করেন। ব্রিজটি কোনো কাজে আসছে না। মালামাল পরিবহনে তাদের বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হচ্ছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

তারা প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

স্থানীয় শিক্ষক জসিম উদ্দিন বলেন, এই সেতু চালু হলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসত। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

শিক্ষক ওমর ফারুক জানান, গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিঙ্গুয়ার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার সুবাদে এই ব্রিজ দিয়ে তার নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়। এছাড়া বহু ছাত্র-ছাত্রী নদী পথেই যাতায়াত করে প্রতিষ্ঠানে আসে। সেতু নির্মাণ হলেও দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় বর্ষা মৌসুমে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলার বিষয়টি শুরুতেই সমাধান না করেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর সময় বাড়ানোই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

তারা আরও বলেন, সংযোগ সড়ক নিশ্চিত না করে সেতু নির্মাণ করা ঠিক হয়নি, আগে সংযোগ সড়ক নির্মাণ জরুরি ছিলো।

মনোহরদী উপজেলা প্রকৌশলী হরষিত কুমার সাহা বলেন, ৯৬ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি পি.এস.সি গার্ডার সেতুর কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২২ সালের ৭ মার্চ কার্যাদেশ জারি হয় এবং নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের ১২ মার্চ পর্যন্ত। বিশেষ অবস্থানগত জটিলতার কারণে কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত সময়সীমা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তবে সংশোধিত সময়সীমা কবে কার্যকর হবে বা কবে সেতু চালু হবে, সেবিষয়ে স্পষ্ট কোনো আশ্বাস দেননি তিনি।

এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত দুই পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণ শেষ করে সেতুটি জনসাধারণের জন্য খুলে দিতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নচেৎ সরকারের ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু অচল অবস্থায় পড়ে থেকে ‘উন্নয়নের নামে অপচয়’-এর আরেকটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।