নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশে যত শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ আছে তাদেরকে অতি শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে। কীভাবে আনা হবে সেই পরিকল্পনা ফাঁস করতে চাই না। শিগগিরই অ্যাকশন শুরু হবে।
রোববার (১ মার্চ) দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে যত শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ আছে তারা অতি শিগগিরই যেন আইনের আওতায় আসে সে ব্যবস্থা আমরা খুব দ্রুত নেব। আমাদের পরিকল্পনা এখানে ফাঁস করতে চাই না। কোনোকিছু বাদ থাকবে না, এদেরকে আইনের আওতায় আনবোই। এ বিষয়ে আমার অত্যন্ত কঠোর।
চট্টগ্রামে গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ দুই মাস আগেও একজন বড় ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা চেয়েছে। এরপর চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ওই ব্যবসায়ীর নিরাপত্তা এবং বাসায় পুলিশ প্রহরী দিয়েছে। সে সন্ত্রাসী গ্রুপ হয়তো সুবিধা পায়নি সেজন্য দুমাস পরে আবার একই রকমের কর্মকাণ্ড করেছে। এ সময় তারা হেভি উইপেন্স (ভারী অস্ত্র) দিয়ে গোলাগুলি করেছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের গোলাগুলির ঘটনায় সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা গেছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে।
বিএনপি দলের নামের চাঁদাবাজির এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তাদের সোপর্দ করেন। কিন্তু কোনো অভিযোগ ঢালাওভাবে করলে তার জবাব দেওয়া যায় না।
আগের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে স্থিতিশীলতা আসে, মানুষের মনে শান্তি এবং নিশ্চয়তা আসে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ হত্যার বিচার নিয়ে এলজিআরডি মন্ত্রী কী বলেছে এ নিয়ে আমি জানি না। আমি এমন কিছু বলিনি। জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার অধ্যাদেশ হয়েছে। জুলাই সনদেও এ বিষয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হয়েছে-সেই নীতিতেই আছে সরকার।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তাকারী হিসেবে সেনাবাহিনী মাঠে ছিলো। সশস্ত্র বাহিনীর মাঠে থাকার বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। তারাও মাঠে থাকতে চায় না। আইনশৃঙ্খলার অবস্থা বিবেচনা করে সশস্ত্র বাহিনী তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতের হাইকমিশনারকে সীমান্ত নিয়ে কথা বলেছি। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা যেন আর শুনতে না হয়, সেজন্য বিজিবি ও বিএসফকে সব সময় এ বিষয়ে বৈঠক করতে থাকে। যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে চলার জন্য বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভারত বলেছে, তারাও আন্তরিক এবং তাদের সব সংস্থাকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বিগত এক দেড় বছরে ভারতের কনসুলেট ও ভিসা অফিসগুলো আক্রমণের শিকার হয়েছে। যার জন্য তারা পুরোদমে সেই ভিসা কার্যক্রম চালু করতে পারেনি। তবে তারা নিশ্চিত করেছে ধারাবাহিকভাবে চালু করবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভারতীয় হাইকমিশনার সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। নতুন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে থাকে এটি তারই অংশ। এছাড়া প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে আমাদের লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। এছাড়া সিকিউরিটি অ্যাস্পেক্ট নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার কথা বলতে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, ভারতের কাছে আমরা একটি সহযোগিতা চেয়েছি, অন দ্যা বেসিস অফ মিউচুয়াল ইন্টারেস্ট অ্যান্ড ডিগনিটি অ্যান্ড মিউচুয়াল বেনিফিট। উভয় দেশ আমাদের সম্পর্ক বজায় রাখবো। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কূটনীতিক সব ক্ষেত্রে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে। আমরা আশা করি ভারত সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে এবং পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে আমাদের সম্পর্কটা বহাল রাখবে।
সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে উভয় দেশকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে নিয়মিত বৈঠক চালিয়ে যেতে ভারতীয় হাইকমিশনারকে অনুরোধ করেছেন তিনি। আজ রোববার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা জানান।
সাংবাদিকেরা জানতে চান, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতে কী আলোচনা হয়েছে? জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভারতীয় হাইকমিশনার সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের হাইকমিশনারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা কূটনৈতিক রীতি। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত, নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন বিষয়ে পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘উভয় দেশের সম্পর্ক সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে বজায় থাকবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। যোগাযোগ অব্যাহত রাখলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে সীমান্ত ইস্যুতে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সীমান্ত হত্যার বিষয়ে যেন আমাদের আর শুনতে না হয়—এ বিষয়ে আমরা সব সময় সতর্ক থাকব। বিজিবি ও বিএসএফ নিয়মিত বৈঠক অব্যাহত রাখবে, যাতে যতটুকু সম্ভব এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যায়।’ তিনি জানান, ভারতীয় পক্ষও এ বিষয়ে আন্তরিক থাকার আশ্বাস দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে।
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। এসব অধ্যাদেশ নতুন সরকার কীভাবে মূল্যায়ন করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করা হবে। কোনগুলো হুবহু গৃহীত হবে, কোনগুলো সংশোধনীসহ পাশ হবে বা কোনগুলো আর প্রয়োজন হবে না তা সংসদেই নির্ধারিত হবে।’ আইন মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।
ফায়ার সার্ভিসের সেবা সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেশ কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অবকাঠামো ও জনবল বাড়িয়ে সেবা স্থায়ী ও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সেখানে সেবা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ছাড়া কোনো উপজেলায় যেন ফায়ার সার্ভিসের অন্তত একটি ইউনিট থাকে, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২৭টি উপজেলায় ফায়ার সার্ভিসের কোনো সেবা কেন্দ্র নেই বলে জানা গেছে। এসব এলাকায় নতুন প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২৫০ জন ফায়ার ফাইটার নিয়োগ দেওয়া হবে। এ নিয়োগ প্রক্রিয়া কীভাবে দুর্নীতিমুক্ত রাখা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। নিয়োগ নিয়ে যাতে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
র্যাবের নাম পরিবর্তন বা বিলুপ্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জনচাহিদা রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদেও র্যাব সম্পর্কে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ আছে। সেখানে নাম পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে। তবে এগুলো রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয় হলেও বাস্তবতা বিবেচনা করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, দেশে একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেটি কী আদলে থাকবে, তাদের জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং কাজের স্বচ্ছতা কীভাবে নির্ধারণ করা যাবে এসব বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
লাইসেন্স করা অস্ত্রের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকার লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় ১০ হাজার অস্ত্র জমা পড়েনি। সেগুলো এখন অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স বাতিলযোগ্য। এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইস্যুকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং সেসব লাইসেন্সের আওতায় কেনা অস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা অস্ত্রের ক্যাটাগরি অনুযায়ী জেলা প্রশাসকদের কাছে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা নির্দেশনার পর যেসব লাইসেন্সধারী অস্ত্র জমা পড়েনি, সেগুলোর বিরুদ্ধে কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে কি না—সে বিষয়েও প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইস্যুকৃত লাইসেন্সগুলোর মধ্যে যেগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়ে থাকতে পারে, সেগুলো চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দেবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া লাইসেন্স চিহ্নিত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















