নিজস্ব প্রতিবেদক :
বছরজুড়েই নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে হাহাকার লেগে থাকে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের। অবস্থার পরিবর্তন হয় না রমজান মাসেও। রোজার দিনগুলোতেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য থাকে লাগামহীন। অথচ প্রতিবারই রমজান এলে সরকারের সংশ্লিষ্টরা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেন। বলা হয়, রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোরভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করা হবে। বলা হয়, রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা হবে। কিন্তু বাস্তবতা তথৈবচ। আদতে হয় না এসবের কোনোকিছুই। ঘটে না আশ্বাসের প্রতিফলনও।
এবারও দুয়ারে কড়া নাড়ছে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র মাহে রমজান। এরই মধ্যে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও একটু একটু করে আরও বাড়তে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত আকাশছোঁয়া এ দাম কোথায় গিয়ে থামে, তা নিয়েই এখন দরিদ্র ও নিম্নবিত্তের মানুষের যত চিন্তা।
শুক্রবার (১০ মার্চ) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতাদের কাছ থেকে বাজারের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে এমন অনেক অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে বাজার ঘুরেও একই দৃশ্য দেখা যায়।
সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আকারভেদে ফুলকপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, শসা প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বেগুন প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, টমেটো ৩০ থেকে ৪০ টাকা, শিম প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, করলা ৮০-৯০ টাকা, চাল কুমড়া প্রতিটি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউ প্রতিটি আকারভেদে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৪০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ১০০ টাকা, কচুর লতি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা ও ধুন্দুল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা কলার হালি বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়। লেবুর হালি বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়।
কমেছে কাঁচামরিচের দাম। বাজারে কাঁচামরিচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা দরে। দুই সপ্তাহ আগে কাঁচামরিচের কেজি ছিল ১৯০ থেকে ২০০ টাকা।
রাজধানীর রামপুরা বাজারের ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন বলেন, রমজান ঘনিয়ে আসছে। তাই বেগুন-লেবুর চাহিদাও বেড়েছে। অনেকে রমজানের আগেই বেশি পরিমাণে কিনে ঘরে মজুত রাখছেন। এ কারণে বাজারে চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে।
অন্যদিকে সবজির দাম কেন বাড়তি, এ বিষয়ে একই বাজারের সবজি বিক্রেতা চাঁদ মিয়া বলেন, শীতের মৌসুম শেষে সবজির দাম বাড়তি থাকবে এটা স্বাভাবিক। কারণ এসময় শীতের সবজির মৌসুম শেষে সিজনাল সবজিগুলো আর হচ্ছে না। নতুন মৌসুমের সিজনাল সবজি উঠতে শুরু করলে আবার দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে শীতের সময় যতটা কম দামে সবজি কেনা গেছে, এখন আর অতটা কমে সবজি পাওয়া যাবে না। এছাড়া পাইকারি মার্কেটেই সব ধরনের সবজির দামই বাড়তি যাচ্ছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রুই মাছ প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া তেলাপিঁয়া প্রতি কেজি ২০০ টাকা, পাবদা প্রতি কেজি ৪০০ টাকা, শিং প্রতি কেজি ৪০০ টাকা, কই প্রতি কেজি ৩০০ টাকা, টেংড়া প্রতি কেজি ৬০০ টাকা, পাঙাস প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি কাতল মাছ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়, শোল মাছ প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, মৃগেল বড় সাইজের প্রতি কেজি ৩৫০, সরপুঁটি ১৮০-২৫০, চিংড়ি জাতভেদে ৪৫০-৬০০, পাবদা মাঝারি ৩৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আগে তো তাও তেলাপিঁয়া, পাঙাস মাছের দাম কম ছিল। এখন এসব গরিবের মাছের দামও বেড়ে গেছে। শুধু সবজি যে খাবো তারও উপায় নেই, কারণ প্রতিটি সবজির দামও বাড়তি।
রাজধানীর মহাখালী বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী খোরশেদ আলম বলেন, বর্তমান বাজারে মাংস কেনা তো মুশকিল আবার মাছের বাজারও চড়া। তবে আগে তেলাপিঁয়া, পাঙাস, চাষের কই এমন জাতীয় মাছগুলো কিনে খাওয়া যেত কিন্তু এখন আর এগুলোর কম দাম নেই। এসবের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে আয়-ব্যয়ের হিসেব এখন মেলানো যাচ্ছে না। ডাল, ভাত, মাছ সবজি খেয়ে যারা কোনোভাবে টিকে থাকছে তাদেরও এখন বিপদ। অতিরিক্ত দামের কারণে আমরা সাধারণ মানুষরা আগে থেকেই ভালো মাছ খেতে পারি না। আর যেসব কম দামি মাছ ছিল এখন সেগুলোর দামও বেড়ে গেছে। একইভাবে বেড়েছে সবজির দাম। আমরা সাধারণ ক্রেতারা কোথায় যাবো?
মাছের দাম বৃদ্ধি নিয়ে রাজধানীর শেওড়াপাড়া বাজারের মাছ বিক্রেতা আকবর আলী বলেন, আসলে মাছের ফিডের (খাওয়ার) দাম বাড়ার পর থেকে মাছের দাম বেড়েছে। এই খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে মাছ চাষীদের অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। যে কারণে তারা অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে, ফলে আমাদেরও কিনতে হচ্ছে বেশি দামেই। যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারের ক্রেতাদের উপর। আমরা কম দামে কিনতে পারলে কম দামেই বিক্রি করতে পারবো। পাঙাস, তেলাপিঁয়া জাতীয় মাছগুলোর দামও এ কারণেই বাড়তি।
সপ্তাহ খানেক আগে ব্রয়লার মুরগির কেজি ২২০ টাকা থাকলেও চলতি সপ্তাহে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা মাসখানেক আগে ছিল ১৬০ টাকা। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩১০ থেকে ৩২০ টাকায় এবং লেয়ার ২৮০ থেকে ২৯০ টাকায়। এ ছাড়াও বাজারে ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪৪ টাকা হালি। হাঁসের ডিম ৭০ থেকে ৭৫ টাকা হালি এবং দেশি মুরগির ডিমের ৬০ থেকে ৬৫ টাকা হালি।
বাজারে আবারও বেড়েছে গরুর মাংসের দাম। প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হতো ৬৪০ থেকে ৬৫০ টাকায়।
বাজারে খাসির মাংসের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১১’শ টাকায়। আগে বিক্রি হতো ৯০০ থেকে এক হাজার টাকায়।
তালতলা বাজারে সঙ্গে কথা হয় রং মিস্ত্রি সুজাউলের। তিনি বলেন, প্রতিদিনই বউ (স্ত্রী) বলে রোজার জন্য চিনি-ছোলা-ডাল কিনে রাখতে। প্রতিদিনই ভাবি নেবো। কিন্তু কোনোদিনই প্রয়োজনের সব বাজার করে ঘরে ফিরতে পারি না। বাড়তি কেনা তো অনেক দূর।
এদিকে বাজারে গত এক মাসে ছোলার দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা। মাসখানেক আগে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা দরে, যা এখন ৯৫-১০০ টাকা। ছোলার সঙ্গে ছোলাবুটের দামও বেড়েছে ৫-১০ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি ছোলাবুট বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ টাকায়। এছাড়া অ্যাংকর ডাল কেজিতে ১০ টাকার মতো বেড়ে ৭০-৮০ টাকা এবং একইভাবে বেসনের দাম বেড়ে ১০০ থেকে ১০৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়, বড় রসুন ২০০ টাকা, ছোট রসুন ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, আদা ২৪০ টাকা।
গত কয়েক মাস ধরেই বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে তেল-চিনি মিলছে না। বেঁধে দেওয়া দামে প্রতি লিটার খোলা পাম তেল ১১৭ টাকায় বিক্রির কথা থাকলেও খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা। একইভাবে সরকার নির্ধারিত প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৬৭ টাকার পরিবর্তে বিক্রি হচ্ছে ১৭২ থেকে ১৭৫ টাকায়। খোলা চিনির ক্ষেত্রে নির্ধারিত দাম ১০৭ টাকা হলেও এখনো খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১১৫ থেকে ১২০ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১২০-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লাল চিনি (দেশি) বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা দামে।
এদিকে মসলার বাজারে আদা-রসুনের বাড়তি দাম কমেনি। উল্টো পেঁয়াজের দাম সপ্তাহ ব্যবধানে ৫ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৩৫-৪০ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৪০-৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে মাছ-মাংস এখন অনেকটাই স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মুরগির বাজার এক-দেড় মাস ধরেই অস্থির। দফায় দফায় বেড়ে ব্রয়লারের কেজি এখন ২৫০-২৫৫ টাকা। সোনালি জাতের মুরগির কেজি ৩৪০-৩৫০ টাকা। প্রতি হালি ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকা দরে।
সপ্তাহ ব্যবধানে বাজারে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে দুই থেকে পাঁচ টাকা। আগে কাটারি চাল প্রতি কেজি ৭০ টাকা বিক্রি হলেও এখন ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চালের বাজারে গিয়ে দেখা যায়, আগের সপ্তাহের তুলনায় চলতি সপ্তাহে মোটা চালের ৫০ কেজির বস্তায় ১০-২০ টাকা বেড়েছে। গতদিন গুটি স্বর্ণা ৪৭-৪৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। নাজির ৭২-৭৩, আটাশ ৫৩-৫৪, মিনিকেট নাম দিয়ে বিক্রি করা চাল ৭০-৭২, আমন লাল চাল ৫৮, চিনিগুঁড়া চাল ১৩০-১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
রাজধানীর কাওরান বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা মো. এনামুল হক বলেন, দুই মাস ধরে রোজায় ব্যবহৃত পণ্যের সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়ানো হচ্ছে। ছোলাসহ আরও বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে পণ্য আমদানি
জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে বাজারে এখন কঠোর মনিটরিং করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সবকটি সংস্থাকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ী ও ভোক্তাকে একটি নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। ব্যবসায়ীদের তদারকি সংস্থাগুলোর সব আদেশ মানতে হবে। পণ্যের দাম কমিয়ে আনতে সহযোগিতা করতে হবে। উচ্চ মুনাফা করার লোভ ত্যাগ করতে হবে। পাশাপাশি ক্রেতার যেখানে একদিনের পণ্য দরকার, সেখানে ১০ দিনের পণ্য একসঙ্গে কেনা বন্ধ করতে হবে। আর সার্বিকভাবে বাজারে অনিয়ম দেখলে সঙ্গে সঙ্গে অসাধুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, বিক্রেতাদের অনেকবার বোঝানো হয়েছে। আমরা সহনশীল পর্যায়ে ছিলাম। বাজার অভিযানকালে দোকানে মূল্যতালিকা থাকে না। পণ্য কী দামে এনে বিক্রি করছে, এর পাকা রসিদ বিক্রেতা দেখাতে বললেও দেখাচ্ছে না। আবার মাঝেমধ্যে তর্কে জড়াচ্ছে। এমন কিছু আর হতে দেওয়া যাবে না। আমরা ব্যবসাবান্ধব বাজার চাই। সেখানে প্রতিযোগিতা হবে। তবে অযৌক্তিক দাম মেনে নেওয়া যাবে না। এবার যদি পণ্যের দাম নিয়ে কেউ কারসাজি করে, ঈদ পর্যন্ত দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















