Dhaka বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ইতিহাসে নতুন রেকর্ড

মার্চ মাসে রেমিট্যান্স এলো ৩৭৫ কোটি ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

দেশের ইতিহাসে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ) মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার পর থেকে একক কোনো মাসে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১২ কোটি ১১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।

বুধবার (১ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এতে বলা হয়, মার্চে দেশে এসেছে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এর আগে গত বছরের মার্চে দেশে এসেছিল ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা এতদিন ছিল দেশের ইতিহাসে কোনো এক মাসে আসা সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স।

সদ্যবিদায়ী মার্চে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৬৪ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে ৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ২৬৪ কোটি ৫০ হাজার ডলার ও বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১ কোটি ২০ হাজার ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের (২০২৫ সালের) মার্চে। ওই মাসটিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার (৩.২৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে। ওই মাসে রেমিট্যান্স আসে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার (প্রায় ৩.২৩ বিলিয়ন)। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে গত জানুয়ারিতে, যার পরিমাণ ছিল ৩১৭ কোটি বা ৩.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্চে ঈদ ঘিরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, এটি স্বাভাবিক একটি প্রবণতা। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে এখনো কাজের সুযোগ বজায় আছে এবং বেকারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়ও খুব বেশি না বাড়ায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতা মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে সামনের মাসগুলোতে এই প্রবাহ কিছুটা কমতে পারে।

অন্যদিকে, হুন্ডি কমে আসায় বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এখন স্বাভাবিক পর্যায় মনে হলেও এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশেষত, নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার পথ এখনো সীমিত থাকায় ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এখনো সামষ্টিকভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর খুব বেশি পড়েনি। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান হারানোর মতো বড় কোনো সংকটের কথা এখনো শোনা যায়নি। একইভাবে শ্রমিকদের মজুরি কমে যাওয়ারও স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

‘মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এখনো তেল উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে আয় করছে। ফলে সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় খুব বেশি বাড়েনি। এ কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতাও এখনো কমে যায়নি। তবে ভবিষ্যতে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পড়তে পারে।’

ড. জাহিদ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে মাসে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসা অনেকটা স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে। তবে মার্চে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের প্রবণতা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া ঠিক হবে না। কোরবানির ঈদের সময় আবারও সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, তবে সেটিও নির্ভর করবে যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর।

তিনি আরও বলেন, নতুন কর্মী পাঠানোর পথ এখনো অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। আগে যেখানে মাসে ৭০ থেকে ৮০ হাজার কর্মী বিদেশে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল, সেটি কমে গেলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশে উৎপাদন সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে কাতারের একটি বড় গ্যাস প্ল্যান্টে হামলার কথা উল্লেখ করেন তিনি, যেখান থেকে বিশ্বের প্রায় ১৭ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ হতো।

তথ্য বলছে, সদ্যবিদায়ী মার্চে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের মাধ্যমে ৬৪ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। বিশষায়িত দুই ব্যাংকের মধ্যে একটির (কৃষি ব্যাংক) মাধ্যমে এসেছে ৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৬৪ কোটি ডলার। আর বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে এক কোটি ২০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স।

তবে এ সময়ে ৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে—বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বা রাকাব, বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামি ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক, বিদেশি খাতের ব্যাংক আলফালাহ, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।

 

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ইতিহাসে নতুন রেকর্ড

মার্চ মাসে রেমিট্যান্স এলো ৩৭৫ কোটি ডলার

প্রকাশের সময় : ০৭:৪১:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

দেশের ইতিহাসে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ) মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার পর থেকে একক কোনো মাসে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১২ কোটি ১১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।

বুধবার (১ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এতে বলা হয়, মার্চে দেশে এসেছে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এর আগে গত বছরের মার্চে দেশে এসেছিল ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা এতদিন ছিল দেশের ইতিহাসে কোনো এক মাসে আসা সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স।

সদ্যবিদায়ী মার্চে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৬৪ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে ৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ২৬৪ কোটি ৫০ হাজার ডলার ও বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১ কোটি ২০ হাজার ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের (২০২৫ সালের) মার্চে। ওই মাসটিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার (৩.২৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে। ওই মাসে রেমিট্যান্স আসে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার (প্রায় ৩.২৩ বিলিয়ন)। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে গত জানুয়ারিতে, যার পরিমাণ ছিল ৩১৭ কোটি বা ৩.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্চে ঈদ ঘিরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, এটি স্বাভাবিক একটি প্রবণতা। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে এখনো কাজের সুযোগ বজায় আছে এবং বেকারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়ও খুব বেশি না বাড়ায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতা মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে সামনের মাসগুলোতে এই প্রবাহ কিছুটা কমতে পারে।

অন্যদিকে, হুন্ডি কমে আসায় বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এখন স্বাভাবিক পর্যায় মনে হলেও এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশেষত, নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার পথ এখনো সীমিত থাকায় ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এখনো সামষ্টিকভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর খুব বেশি পড়েনি। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান হারানোর মতো বড় কোনো সংকটের কথা এখনো শোনা যায়নি। একইভাবে শ্রমিকদের মজুরি কমে যাওয়ারও স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

‘মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এখনো তেল উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে আয় করছে। ফলে সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় খুব বেশি বাড়েনি। এ কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতাও এখনো কমে যায়নি। তবে ভবিষ্যতে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পড়তে পারে।’

ড. জাহিদ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে মাসে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসা অনেকটা স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে। তবে মার্চে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের প্রবণতা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া ঠিক হবে না। কোরবানির ঈদের সময় আবারও সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, তবে সেটিও নির্ভর করবে যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর।

তিনি আরও বলেন, নতুন কর্মী পাঠানোর পথ এখনো অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। আগে যেখানে মাসে ৭০ থেকে ৮০ হাজার কর্মী বিদেশে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল, সেটি কমে গেলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশে উৎপাদন সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে কাতারের একটি বড় গ্যাস প্ল্যান্টে হামলার কথা উল্লেখ করেন তিনি, যেখান থেকে বিশ্বের প্রায় ১৭ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ হতো।

তথ্য বলছে, সদ্যবিদায়ী মার্চে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের মাধ্যমে ৬৪ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। বিশষায়িত দুই ব্যাংকের মধ্যে একটির (কৃষি ব্যাংক) মাধ্যমে এসেছে ৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৬৪ কোটি ডলার। আর বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে এক কোটি ২০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স।

তবে এ সময়ে ৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে—বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বা রাকাব, বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামি ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক, বিদেশি খাতের ব্যাংক আলফালাহ, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।