স্পোর্টস ডেস্ক :
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার তাদের অবস্থানে অটল রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই অবস্থান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই কথা বলেন উপদেষ্টা। বৈঠকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলসহ বোর্ডের পরিচালক এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের অবস্থান আইসিসিকে বোঝাতে সক্ষম হবেন বলে আশা প্রকাশ করে আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, বাংলাদেশের মর্যাদা- এটার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করবো না। আমরা ক্রিকেট খেলতে চাই, আমরা বিশ্বকাপ খেলতে চাই। আরেকটা যে আয়োজক দেশ আছে শ্রীলংকা, আমরা সেখানে খেলতে চাই। এই পজিশনে (ভারতে খেলতে না যাওয়া) আমরা অনড় আছি। আমরা কেন অনড় আছি, আমরা আশা করি সেটা আইসিসিকে বোঝাতে সক্ষম হব। আইসিসি আমাদের যুক্তিগুলো সহৃদ্যতার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করে আমরা কষ্ট করে যেটা অর্জন করেছি সেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমাদের খেলার সুযোগ করে দিবে।
সবকিছুর সূত্রপাত ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে। গত কিছুদিন ধরেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর উঠে আসছিল, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংস নানা ঘটনার পর ভারতে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। মুস্তাফিজের আইপিলে খেলতে দেওয়া নিয়েও নানা বিতর্ক চলছিল।
এসবের জের ধরে গত শনিবার ভারতীয় বোর্ডের সচিব দেবাজিৎ সাইকিয়া জানান, বাংলাদেশের পেসারকে বাদ দিতে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা। এর পরপরই কলকাতা দল খেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নেওয়া পেসারকে তারা ছেড়ে দিয়েছে।
মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় বাংলাদেশে। শনিবার রাতেই ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেইসবুকে পোস্টে বলেন, বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দলের ভারতে যাওয়া তিনি নিরাপদ মনে করছেন না। বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেন ওই পোস্টে।
এরপর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আইপিএলের সকল খেলা ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ রাখতে সোমবার নির্দেশ আসে তথ্য মন্ত্রণালায়ের তরফ থেকে।
নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি)। পরদিন আইসিসির কাছে চিঠি পাঠিয়ে বিসিবি জানায়, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আগামী মাসের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না তারা। বাংলাদেশের ম্যাচগুলি ভারতের বাইরে নেওয়ার অনুরোধ করা হয় সেই চিঠিতে।
বিসিবির এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় হারভাজান সিং বলেছেন, ভারত সব দলকে আতিথেয়তা দিতে প্রস্তুত। দেশটির সাবেক এই স্পিনারের মতে, ভারতে খেলতে যাওয়া না-যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশেরই।
আইপিএল থেকে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া নিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা কেবল নিরাপত্তাই না, জাতীয় অবমাননার ইস্যু। আমরা নিরাপত্তার ইস্যুকে মুখ্য করে দেখছি। ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড নিজেরাই বলছে কলকাতাকে যে এই ক্রিকেটারকে নিরাপত্তা দেওয়া যাচ্ছে না। তাকে আপনাদের টিম থেকে বাদ দেন। এটিই একটি ট্যাসিট রিকগনিশন যে ভারতে নিরাপদে খেলার পরিবেশ নেই। ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির বিগার পিকচার নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের নিরাপত্তা ও মর্যাদা, সেই প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করবো না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের প্রথম স্ট্যান্ড হচ্ছে আইসিসিকে বোঝানো। আমাদের কাছে যথেষ্ঠ শক্ত যুক্তি আছে, সেটা দিয়ে আমরা আইসিসিকে বোঝাব। আমাদের স্ট্যান্ডের মূলনীতি হচ্ছে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নে আমরা আপস করবো না। কিন্তু আমরা অবশ্যই ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলতে চাই। পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আবারও বসে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এখন পর্যন্ত আমরা এই সিদ্ধান্ত ক্লিয়ারলি নিয়েছি যে, আমরা আইসিসিকে বোঝাব যে আমাদের ভারতে খেলার মতো পরিবেশ নেই।
আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কবে জানানো হবে জানতে চাইলে আসিফ নজরুল বলেন, আজ রাত কিংবা কালকে সকালের মধ্যে বলে দেওয়া হবে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে আমরা আইসিসিকে আমরা প্রথমে লিখেছিলাম, খেলোয়াড়দের দেখার স্কোপ আমাদের আছে। কিন্তু খেলোয়াড়দের বাইরে যে একটি বড় জনগোষ্ঠী আছে, আমাদের সাংবাদিক, ক্রিকেট স্পনসররা আছেন, ক্রিকেট ভক্তরা আছেন, তারা খেলা দেখতে যাবেন, এ জন্য আমরা সরকারের পরামর্শ দিচ্ছি। কারণ, বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার সময় আমাদের সরকারের অর্ডার লাগে। সেই বিষয়ে আমরা জানতে এসেছিলাম।
বৈঠক শেষে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতের অধিকার আমরা লড়াই করে যাব। এর আগে অনেকগুলো বিশ্বকাপ খেলেছি, কখনো আমরা এমন কথা বলিনি। এবার যৌক্তিক কারণ আছে বলেই আমরা বলেছি। আশা করছি, আইসিসির কাছে আমরা আমাদের যুক্তি বোঝাতে পারবো। ভারত একটি খেলোয়াড়কে নিরাপত্তা দিতে পারছে না, সেখানে পুরো ক্রিকেট টিম ও সংশ্লিষ্টদের কীভাবে তারা নিরাপত্তা দেবেন—সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ যদি ভারতে গিয়ে খেলতে না চায়, সেক্ষেত্রে যদি এই বিশ্বকাপটিতেই ছাড় দিতে হয়, তাহলে কী করা হবে জানতে চাইলে বুলবুল বলেন, বিসিবি সেটাও বিবেচনা করবে। যখন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হয়েছিল, তখন পাকিস্তানে যায়নি ভারত, গত কয়েকটি বিশ্বকাপ খেলতে পাকিস্তানও ভারত যায়নি। আমরাও আশা করছি, একটি সঠিক জবাব পাব।
প্রসঙ্গত, প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকায় বাংলাদেশি তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) আগামী আসরের জন্য কিনেছিল বলিউড মেগাস্টার শাহরুখ খানের মালিকানাধীন কলকাতা নাইট রাইডার্স।
কিন্তু কয়েকদিন না যেতেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সরাসরি নির্দেশে মুস্তাফিজকে বাদ দিতে বাধ্য হয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। তার বদলে বিকল্প একজন খেলোয়াড়কে নিয়েও নিয়েছে দলটি।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ গোটা বাংলাদেশ। সবারই প্রশ্ন, একজন মুস্তাফিজের নিরাপত্তাই যদি ভারত দিতে না পারে, তবে আগামী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গোটা বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা তারা কীভাবে নিশ্চিত করবে।
এরপরই নানা পক্ষের দাবির মুখে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আইপিএল খেলার সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে সরকার। তারপর নেওয়া হয় ভারতে বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। সে সিদ্ধান্তে যে বাংলাদেশ অনড়, এবার তাও জানানো হলো।
স্পোর্টস ডেস্ক 





















