মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি :
গণতন্ত্রের সূচনা ও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বিকেলে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আয়োজনে সদর উপজেলার শেরপুরের আইনপুর মাঠে নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা যদি দেশে গণতন্ত্রের সূচনা করতে চ আর জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চাই । তাহলে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল প্রতিটি মানুষ মন খুলে কথা বলতে পেরেছে, সরকারের সমালোচনা করতে পেরেছে। কোনো মানুষ গুমের শিকার হয় নাই। ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে কেউ বাধা দেয় নাই। আমরা দেশে আবার সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে একটি দল একটি দেশকে দাসখত দিয়েছিল, গত ১৬ বছর আরেকটি দল একই কাজ করেছে। তাই দেশকে বাঁচাতে, গণতন্ত্রের সূচনা করতে ও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে ধানের শীষে সিল মারতে হবে।
তিনি আরো বলেন, একটি রাজনৈতিক দল, যাদের ভূমিকা ৫০ বছর আগে আমরা দেখেছি। তারা নিরীহ মা-বোনদের বাড়িতে গিয়ে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করছে। এটি মুনাফেকি নয়, রীতিমতো শিরক। তারা ৭১ সালে মানুষ হত্যা করেছে। এখন বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করে শিরকের অন্তর্ভুক্ত করছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান হুঁশিয়ার করে বলেন, যারা ভোটের আগে ধর্মীয় অনূভুতিতে আঘাত করে লোক ঠকাচ্ছে, তারা ক্ষমতায় গেলে কীভাবে ঠকাবে চিন্তা করেন।
দেশে ফের ভোট চুরির ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, পত্রপত্রিকা তো কমবেশি সবাই পড়েন পড়েন না? ফেসবুক তো কমবেশি সবাই দেখেন দেখেন না? এই ফেসবুকে দেখেন, পত্রপত্রিকায় এসেছে একটি সংবাদ; কী সেই সংবাদ? মধ্যপ্রাচ্যসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এনআইডি কার্ড নিয়ে মোবাইল নম্বর নিয়ে মা বোনদেরকে বিভ্রান্ত করছে একটি দল; দেখেছেন? একটি দল বিভিন্ন ভাবে বিভ্রান্ত করছে। আমরা দেখেছি গত ১৫ বছর ১৬ বছর জনগণের ভোট ডাকাতি হয়েছে, এখন এই দেশে এখন বর্তমানে আরেকটি রাজনৈতিক দল তারা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এখানে আজকে যারা উপস্থিত আছেন, আপনাদের কাছে আমি বিনীত অনুরোধ করব এবং আপনাদের মাধ্যমে এই পুরো জেলার চারটি নির্বাচনি এলাকার যত ভাই-বোন, মুরুব্ব আছেন, যারা দাঁড়িয়ে আছেন- সকলকে আমি অনুরোধ করব, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সজাগ থাকার জন্য। কারণ এরা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং এরা ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। পত্রিকায় পড়েছি আমরা, সোশাল মিডিয়াতে দেখেছি যে ব্যালট পেপার তারা গায়েব করে দিচ্ছে; সব ব্যালট পেপার নিজেদের পক্ষ নিয়ে নিয়েছে অর্থাৎ আবার ভোট চুরির প্রক্রিয়া তারা শুরু করেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এখন ভাই এই যে দলটি সম্পর্কে সজাগ থাকতে বললাম; এই দল সম্পর্কে আরেকটি কথা বলি আপনাদের সামনে। কয়েকদিন যাবৎ আমরা কী দেখছি? আমরা দেখতে পাচ্ছি, তারা বিভিন্নভাবে মানুষকে কতগুলো কথা বলছে- যা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা এবং শুধু মিথ্যা কথাই নয়, গুনাহের কথা তারা বলছে। আসুন প্রথমে তাদের মিথ্যা কথা কী বলছে, সেটি আমরা দেখি- কী সেই মিথ্যা কথা? …১৯৭১ সালে এই মাটিকে এই মাটির সাথে রক্ত মিশিয়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বুকের রক্ত তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশ স্বাধীন করেছেন। এই যে দলটি সম্পর্কে আপনাদেরকে সজাগ থাকতে বলছি, আমরা দেখেছি তখন কী ভূমিকা ছিল তাদের। যদি তাদের ভূমিকা সেই সময় দেশের পক্ষে থাকত, যদি তাদের ভূমিকা সেই সময় দেশের জনগণের পক্ষে থাকত; তাহলে লক্ষ লক্ষ মানুষ শহীদ হতে হতো না।
জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, আরে ভাই, আপনাদেরকে তো মানুষ ’৭১ সালেই দেখেছে; ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। ’৭১ সালে মানুষ দেখেছে আপনারা কীভাবে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তারপরে লক্ষ লক্ষ মা বোনের সম্মানহানি হয়েছে ’৭১ সালে। দেশের মানুষ দেখেছে- আপনাদের ভূমিকার কারণে এদেশের লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন; অনেক মানুষ পঙ্গু হয়েছে। কাজেই আপনাদেরকে আরও ৫০ বছর আগে দেখে ফেলেছে আপনাদের ভূমিকা কী।
বিএনপির প্রধান বলেন, আমরা দেখছি এই কথাগুলো যখন তাদের বের হয়ে যাচ্ছে, মানুষ যখন বুঝতে পারছে যে তারা বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে, তারা দেশের মানুষের মধ্যে বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে- এইটা যখন মানুষ বুঝতে পারছে এবং এইটা যখন তারাও বুঝতে পারছে যে মানুষ তাদের চালাকি, তাদের ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছে; তখন তারা সরকারকে গিয়ে বলছে নিরাপত্তা দিতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে; প্রটোকল দিতে হবে, প্রটোকল দিতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যারা প্রধান আছেন, ডক্টর ইউনূসসহ সকলকে অনুরোধ করব- তাদেরকে যে প্রটোকল দিয়েছেন, আমাদেরকে যে নিরাপত্তা দিয়েছেন; আমরা আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি- সরকারের কাছে বিএনপির পক্ষ থেকে, এই লাখো জনতার পক্ষ থেকে, তাদের প্রটোকল দরকারের তিন ডাবল করে দেন। তাদের প্রটোকল তিন ডাবল করে দেন, কারণ তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং মানুষ এইটা জানতে পেরে মানুষ তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হচ্ছে। আমরা চাই না, মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষ কিছু করে বসুক।
দেড় দশকের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার দিন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, তার বিস্তারিত তুলে ধরলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমি একটানা ১৭ বছর পর যখন বিদেশ থেকে ফিরে এসেছি, একটি কথা বলেছিলাম- মনে আছে আপনাদের, আই হ্যাভ এ প্ল্যান বলেছিলাম না? সেই প্ল্যানের অর্থ একটি অংশ হচ্ছে আমরা এদেশের বেকার যারা যুবক আছে; শিক্ষিত হোক, অল্প শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত- সকল মানুষের জন্য আমরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। যাতে এই মানুষগুলো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, শক্ত ভিত্তির ওপর যাতে এই মানুষগুলো দাঁড়াতে পারে।

তিনি আরো বলেন, যুব সমাজের যারা সদস্য, তরুণ সমাজের যারা সদস্য- তাদের শুধু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নয়; আমরা তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবেও সক্ষম গড়ে তুলতে চাই। যেন আপনারা লন্ডনে যান, অথবা এখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যান, অথবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে যান; আমরা আপনাদেরকে ট্রেনিং দিয়ে পাঠাব; আপনাদেরকে সেই দেশের ভাষা শিক্ষা দিয়ে পাঠাব, যাতে ওই দেশে গিয়ে আপনারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা দ্রুত করতে পারেন। যাতে করে আপনাদের আয়-রোজগার যদি আপনারা কোনো রকম দক্ষ না হয়ে সে দেশে যান, আয় রোজগার কম হবে; কিন্তু যদি কোনো ট্রেনিং নিয়ে যান তাহলে কী হবে? রোজগার বেশি হবে না? আমরা সেই ব্যবস্থা এদেশের মানুষের জন্য করতে চাই।
তারেক রহমান বলেন, এই এলাকায় তো ১৩০টির মতন চা বাগান রয়েছে, আছে না? এই চা বাগানের শ্রমিকরা বিশেষ করে নারী শ্রমিক যারা, তারা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়। তাদের যে আয় রোজগার হয়, সেটি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। সেই সকল পরিবারকে, সেই সকল নারীদেরকে আমরা ফ্যামিলি কার্ড দিতে চাই এবং ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে তাদেরকে আমরা হয় খাদ্য সহায়তা দেব অথবা তাদেরকে আমরা নগদ সহায়তা দেব যাতে করে তারা তাদের সংসার সুন্দর ভাবে গড়ে তুলতে পারে সুন্দর ভাবে চালিয়া নিতে পারে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, প্রিয় ভাই-বোনেরা চা শ্রমিকরা যেমন পাবে, একইভাবে একজন দিনমজুর- তার স্ত্রীও সেই ফ্যামিলি কার্ড পাবে। একজন শ্রমিক, একজন কৃষক ভাই- তার স্ত্রীও এই ফ্যামিলি কার্ড পাবে। কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ডের পাশাপাশি দেশের প্রত্যেক পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলেন তারেক রহমান। সেই সঙ্গে ইমাম-মুয়াজিনদের সম্মানী দেওয়ার ভাবনা তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, আমরা যেমন কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে চাইছি। আমরা যেমন আমাদের মা বোনদের পাশে দাঁড়াতে চাইছি, আমরা যেমন আমাদের তরুণ সমাজ যুব সমাজের যারা বেকার, তাদের ট্রেনিং দেওয়ার মাধ্যমে, ভাষা শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে যেমন তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে যেমন চাচ্ছি; একইভাবে আরেক শ্রেণির মানুষের পাশে আমরা দাঁড়াতে চাচ্ছি, তারা কারা? তারা আমাদেরই আপনজন, আমাদেরই নিকটজন। এই মানুষগুলো আমাদের দুঃখের সময় আমাদের সাথে থাকেন, সুখের সময়ও আমাদের সাথে থাকেন; জীবনেও আমাদের সাথে থাকেন, মৃত্যুর সময়ও আমাদের সাথে থাকেন। অর্থাৎ আমাদের বিভিন্ন সারা দেশে যে মসজিদ আছে, মাদ্রাসা আছে; সেখানকার খতিব সাহেবরা, সেখানকার ইমাম সাহেবরা- মোয়াজ্জেম সাহেবরা। আমরা এই মানুষগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্মানির ব্যবস্থা করতে চাই। যেন মসজিদের ইমাম সাহেব, খতিব সাহেব, মোয়াজ্জেম সাহেবরা আত্মসম্মান নিয়ে সম্মানের সাথে এই সমাজে বসবাস করতে পারেন।
মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি 




















