Dhaka সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে তা নির্ধারণেই গণভোট : আলী রীয়াজ

বরিশাল জেলা প্রতিনিধি : 

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে তা নির্ধারণ করে দিতেই এবারের গণভোট।

রোববার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে বরিশাল বেলস পার্কে বিভাগীয় প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, অন্যান্য নির্বাচনে যেমন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া হয়, গণভোট তেমন নয়। গণভোট হচ্ছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে, তার পথরেখা নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রের কাঠামো ও শাসনব্যবস্থার বিষয়ে সরাসরি মত দেওয়ার সুযোগ পান, যা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে।

সম্মেলনে আসন্ন গণভোটে সরকারের প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, অনেক সংগ্রামের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশের প্রকৃত মালিক দেশের জনগণ। গণভোটের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখা তৈরি হবে। আগামী দিনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দেশ কীভাবে চালাবেন, এই গণভোটের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার সুযোগ সবাইকে কাজে লাগাতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছি, যেখানে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। কিন্তু বিগত চুয়ান্ন বছরেও আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারিনি। তিনি বলেন, গত ষোল বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন, অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে এটুকু পরিষ্কার যে, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া আমরা এগিয়ে যেতে পারব না।

আলী রিয়াজ বলেন, দিনের ভোট রাতে হওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতেই আমরা গণভোটের পথে হাঁটছি। এই দেশে কথায় কথায় সরকার বদলের যে পুরোনো ইতিহাস রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জনগণের রায়ই চূড়ান্ত হতে হবে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। কয়েকটি দল এতে আরও দুটি প্রস্তাব যুক্ত করার কথা বলেছে, যা সনদে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। দলগুলো নির্বাচনে বিজয়ী হলে এসব বাস্তবায়নের বিষয়ে একমত হলেও, চূড়ান্ত বৈধতা আসবে কেবল জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে।

সংবিধান প্রসঙ্গে আলী রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান একাধিকবার রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োগে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে মাত্র ১৭ মিনিটে সংবিধান সংশোধনের ইতিহাস রয়েছে। এক সময় জনগণের প্রবল দাবিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হলেও পরে তা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করা হয়।

তিনি বলেন, এই পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল মোট ভোটের ৫০ শতাংশ অর্জন করতে পারেনি। ফলে উচ্চকক্ষে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গণভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের বাইরের বিপুল জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়াই তাই অপরিহার্য।

রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা নির্ধারণের প্রসঙ্গে আলী রিয়াজ বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং নিপীড়নের ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণেই সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি টানা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এই দেশে আমরা ক্ষমা প্রদর্শনের নামে বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে তামাশা হতে দেখেছি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে ক্ষমা প্রদান করেন- বাস্তবতা হলো, ক্ষমার সিদ্ধান্ত আসে অন্য জায়গা থেকে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, অনেকে বলেন, গণভোটের মার্কা কী? উত্তর হচ্ছে- গণভোটের মার্কা হচ্ছে টিকচিহ্ন। ওইটাই গণভোটের মার্কা, যদি আপনি হ্যাঁ বলতে চান তাহলে ওই মার্কায় ভোট দিতে হবে।

আলী রীয়াজ বলেন, আপনাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য, বিশ্বাস, ভিন্ন দল থাকবে- সেটার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাদা রঙের ব্যালট। আর গোলাপী রঙের ব্যালটটি হচ্ছে গণভোটের।

আলী রীয়াজ আরও বলেন, অতিতে যে সমস্ত গণভোট হয়েছে, তাতে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, পরে সম্মতি চাওয়া হয়েছে। এবার আগে সম্মতি চাওয়া হচ্ছে পরে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে- এটা হচ্ছে পার্থক্য। আগে আপনি, তারপর আপনার প্রতিনিধি; আপনাকে ছাড়া আপনার প্রতিনিধি নয়।

আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের ১৩ কোটি ভোটারের হাতে চাবির মতো করে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই চাবি দিয়ে দরজা খুলুন, দরজার খোলার পর ভবিষ্যতে দলমত ধর্মবিশ্বাস সমস্ত কিছুকে নিজেদের মতো রেখে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আমরা এমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করি যার প্রতিশ্রুতি করেছিলাম ১৯৭১ সালে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের। আসেন আমরা সবাই মিলে সেই চেষ্টায় সামিল হই।

তিনি বলেছেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট এ তরুণ ও সব নাগরিক সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ রচনা করেছিলেন এবং একটি ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাস্ত করে তার প্রধানকে পলায়নে বাধ্য করেছিলেন। সে সময় শুধু একজন কথিত প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে যাননি, তার তৈরি করা পার্লামেন্টের সদস্যরাও পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। জনগণের রোষ যখন তৈরি হয় এখন পালানো ছাড়া আর কোনও পথ থাকে না।’

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে কম বেশি পরিচিত। বিশেষ করে গত ১৬ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত। গত ১৬ বছর ধরে বিশেষ করে করে ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকরা গেছে- গুম, খুন, হত্যা, লুণ্ঠন- এটা আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া অগ্রসর হতে পারবো না। সেই জায়গা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই জায়গা থেকে আমরা এগিয়ে যেতে চাইবো। তার একটি সম্ভাবনা হচ্ছে গণভোট।’

এ সময় তিনি গণভোটের বিষয়বস্তু ও গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘গণভোটের উপকারিতা ইমামদের মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এতে আগামীর বাংলাদেশ একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।’

তিনি বলেন ‘আপনাদের ভোটে যাদের নির্বাচিত করবেন তারা পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু দেশ পাঁচ বছরের জন্য না। আমরা সবাই দেশের মালিক, সবাই গণভোটের মাধ্যমে নির্দেশনা দেবো দেশ কীভাবে চলবে। আর যাতে কোনও মায়ের বুক খালি না হয় তার জন্যই গণভোট। জাতীয় সনদ কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে। আর সেটারই বাস্তবায়ন করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে ভিন্নমত, দল থাকবে কিন্তু ভবিষ্যতে দেশ কেমন হবে সেটা নির্ধারণ করবে জনগণ। জাতীয় সনদের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন ও স্বাধীন পিএসসি বোর্ড গঠিত হবে- যাতে অযোগ্য ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীনদের নাম ভাঙিয়ে কোনও চেয়ারে না বসতে পারে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘৭১ সালে আমরা তো পিছিয়ে পড়ার জন্য যুদ্ধ করিনি। তাহলে কেন আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবো। এর আগেও দেশে তিনবার গণভোট হয়েছিল। কিন্তু এবারের গণভোট ভিন্ন। অতীতে আমরা দেখেছি সংসদে যা ঠিক করা হয় আমরা তাতে সম্মতি দেই। এবারে গণভোট বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার নিয়ে সংসদে যেতে হবে জনপ্রতিনিধিদের।’

বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে এতদিন ছেলে খেলা হয়েছে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, ‘১৭ মিনিটে এ দেশে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে দেশের সব মানুষের সমর্থন ছিল। যা বাতিল করা হয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে। এরপর থেকে সংবিধান সংশোধন করতে হলে জাতীয় উচ্চকক্ষের অনুমতি লাগবে- মানে ৫১টি ভোট লাগবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমার নামে এতদিন যে তামাশা করা হয়েছে- জাতীয় সনদে তা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি আসলে নিজে ক্ষমা করেন না। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে তার নামে ক্ষমার চিঠি ইস্যু হয়। জাতীয় সনদে সংসদে এমন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যাতে নিজ দলের বেইনসাফি কথার বিরুদ্ধে দলের নেতারা কথা বলতে পারবে। যা সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে।

বরিশালে বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন- প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন, বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ আলম, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

মুন্সীগঞ্জে-৩ : স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিনের মনোনয়নপত্র বৈধ

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে তা নির্ধারণেই গণভোট : আলী রীয়াজ

প্রকাশের সময় : ০৮:২৮:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

বরিশাল জেলা প্রতিনিধি : 

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে তা নির্ধারণ করে দিতেই এবারের গণভোট।

রোববার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে বরিশাল বেলস পার্কে বিভাগীয় প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, অন্যান্য নির্বাচনে যেমন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া হয়, গণভোট তেমন নয়। গণভোট হচ্ছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে, তার পথরেখা নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রের কাঠামো ও শাসনব্যবস্থার বিষয়ে সরাসরি মত দেওয়ার সুযোগ পান, যা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে।

সম্মেলনে আসন্ন গণভোটে সরকারের প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, অনেক সংগ্রামের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশের প্রকৃত মালিক দেশের জনগণ। গণভোটের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখা তৈরি হবে। আগামী দিনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দেশ কীভাবে চালাবেন, এই গণভোটের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার সুযোগ সবাইকে কাজে লাগাতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছি, যেখানে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। কিন্তু বিগত চুয়ান্ন বছরেও আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারিনি। তিনি বলেন, গত ষোল বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন, অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে এটুকু পরিষ্কার যে, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া আমরা এগিয়ে যেতে পারব না।

আলী রিয়াজ বলেন, দিনের ভোট রাতে হওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতেই আমরা গণভোটের পথে হাঁটছি। এই দেশে কথায় কথায় সরকার বদলের যে পুরোনো ইতিহাস রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জনগণের রায়ই চূড়ান্ত হতে হবে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। কয়েকটি দল এতে আরও দুটি প্রস্তাব যুক্ত করার কথা বলেছে, যা সনদে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। দলগুলো নির্বাচনে বিজয়ী হলে এসব বাস্তবায়নের বিষয়ে একমত হলেও, চূড়ান্ত বৈধতা আসবে কেবল জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে।

সংবিধান প্রসঙ্গে আলী রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান একাধিকবার রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োগে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে মাত্র ১৭ মিনিটে সংবিধান সংশোধনের ইতিহাস রয়েছে। এক সময় জনগণের প্রবল দাবিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হলেও পরে তা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করা হয়।

তিনি বলেন, এই পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল মোট ভোটের ৫০ শতাংশ অর্জন করতে পারেনি। ফলে উচ্চকক্ষে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গণভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের বাইরের বিপুল জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়াই তাই অপরিহার্য।

রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা নির্ধারণের প্রসঙ্গে আলী রিয়াজ বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং নিপীড়নের ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণেই সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি টানা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এই দেশে আমরা ক্ষমা প্রদর্শনের নামে বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে তামাশা হতে দেখেছি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে ক্ষমা প্রদান করেন- বাস্তবতা হলো, ক্ষমার সিদ্ধান্ত আসে অন্য জায়গা থেকে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, অনেকে বলেন, গণভোটের মার্কা কী? উত্তর হচ্ছে- গণভোটের মার্কা হচ্ছে টিকচিহ্ন। ওইটাই গণভোটের মার্কা, যদি আপনি হ্যাঁ বলতে চান তাহলে ওই মার্কায় ভোট দিতে হবে।

আলী রীয়াজ বলেন, আপনাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য, বিশ্বাস, ভিন্ন দল থাকবে- সেটার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাদা রঙের ব্যালট। আর গোলাপী রঙের ব্যালটটি হচ্ছে গণভোটের।

আলী রীয়াজ আরও বলেন, অতিতে যে সমস্ত গণভোট হয়েছে, তাতে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, পরে সম্মতি চাওয়া হয়েছে। এবার আগে সম্মতি চাওয়া হচ্ছে পরে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে- এটা হচ্ছে পার্থক্য। আগে আপনি, তারপর আপনার প্রতিনিধি; আপনাকে ছাড়া আপনার প্রতিনিধি নয়।

আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের ১৩ কোটি ভোটারের হাতে চাবির মতো করে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই চাবি দিয়ে দরজা খুলুন, দরজার খোলার পর ভবিষ্যতে দলমত ধর্মবিশ্বাস সমস্ত কিছুকে নিজেদের মতো রেখে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আমরা এমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করি যার প্রতিশ্রুতি করেছিলাম ১৯৭১ সালে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের। আসেন আমরা সবাই মিলে সেই চেষ্টায় সামিল হই।

তিনি বলেছেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট এ তরুণ ও সব নাগরিক সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ রচনা করেছিলেন এবং একটি ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাস্ত করে তার প্রধানকে পলায়নে বাধ্য করেছিলেন। সে সময় শুধু একজন কথিত প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে যাননি, তার তৈরি করা পার্লামেন্টের সদস্যরাও পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। জনগণের রোষ যখন তৈরি হয় এখন পালানো ছাড়া আর কোনও পথ থাকে না।’

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে কম বেশি পরিচিত। বিশেষ করে গত ১৬ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত। গত ১৬ বছর ধরে বিশেষ করে করে ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকরা গেছে- গুম, খুন, হত্যা, লুণ্ঠন- এটা আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া অগ্রসর হতে পারবো না। সেই জায়গা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই জায়গা থেকে আমরা এগিয়ে যেতে চাইবো। তার একটি সম্ভাবনা হচ্ছে গণভোট।’

এ সময় তিনি গণভোটের বিষয়বস্তু ও গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘গণভোটের উপকারিতা ইমামদের মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এতে আগামীর বাংলাদেশ একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।’

তিনি বলেন ‘আপনাদের ভোটে যাদের নির্বাচিত করবেন তারা পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু দেশ পাঁচ বছরের জন্য না। আমরা সবাই দেশের মালিক, সবাই গণভোটের মাধ্যমে নির্দেশনা দেবো দেশ কীভাবে চলবে। আর যাতে কোনও মায়ের বুক খালি না হয় তার জন্যই গণভোট। জাতীয় সনদ কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে। আর সেটারই বাস্তবায়ন করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে ভিন্নমত, দল থাকবে কিন্তু ভবিষ্যতে দেশ কেমন হবে সেটা নির্ধারণ করবে জনগণ। জাতীয় সনদের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন ও স্বাধীন পিএসসি বোর্ড গঠিত হবে- যাতে অযোগ্য ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীনদের নাম ভাঙিয়ে কোনও চেয়ারে না বসতে পারে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘৭১ সালে আমরা তো পিছিয়ে পড়ার জন্য যুদ্ধ করিনি। তাহলে কেন আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবো। এর আগেও দেশে তিনবার গণভোট হয়েছিল। কিন্তু এবারের গণভোট ভিন্ন। অতীতে আমরা দেখেছি সংসদে যা ঠিক করা হয় আমরা তাতে সম্মতি দেই। এবারে গণভোট বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার নিয়ে সংসদে যেতে হবে জনপ্রতিনিধিদের।’

বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে এতদিন ছেলে খেলা হয়েছে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, ‘১৭ মিনিটে এ দেশে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে দেশের সব মানুষের সমর্থন ছিল। যা বাতিল করা হয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে। এরপর থেকে সংবিধান সংশোধন করতে হলে জাতীয় উচ্চকক্ষের অনুমতি লাগবে- মানে ৫১টি ভোট লাগবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমার নামে এতদিন যে তামাশা করা হয়েছে- জাতীয় সনদে তা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি আসলে নিজে ক্ষমা করেন না। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে তার নামে ক্ষমার চিঠি ইস্যু হয়। জাতীয় সনদে সংসদে এমন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যাতে নিজ দলের বেইনসাফি কথার বিরুদ্ধে দলের নেতারা কথা বলতে পারবে। যা সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে।

বরিশালে বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন- প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন, বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ আলম, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।