নিজস্ব প্রতিবেদক :
গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ৫১৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৪৩২ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৬৮ জন। একই সময়ে ৮টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ৪৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন।
রোববার (৮ মার্চ) সংবাদমাধ্যমে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের পাঠানো ‘ফেব্রুয়ারি মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন’-এ এসব তথ্য জানানো হয়। ফাউন্ডেশনটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৭৪ জন ৪০.২৭ শতাংশ, বাসের যাত্রী ২২ জন ৫.০৯ শতাংশ, ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর-লরি আরোহী ২৪ জন ৫.৫৫ শতাংশ, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস আরোহী ১৬ জন ৩.৭০ শতাংশ, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা) ৬৪ জন ১৪.৮১ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-টমটম-মাহিন্দ্র) ২৩ জন ৫.৩২ শতাংশ এবং বাইসাইকেল আরোহী ৭ জন ১.৬২ শতাংশ নিহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলা হয়, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৫৭টি ৩০.৩৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২১৩টি ৪১.১৯ শতাংশ) আঞ্চলিক সড়কে, ৫৬টি ১০.৮৩ শতাংশ গ্রামীণ সড়কে এবং ৮৪টি ১৬.২৪ শতাংশ শহরের সড়কে এবং ৭টি ১.৩৫ শতাংশ অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনাসমূহের ১১৩টি ২১.৮৫ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২২৮টি ৪৪.১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১০৪টি ২০.১১ শতাংশ পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেওয়া, ৬৮টি (১৩.১৫ শতাংশ যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ৪টি ০.৭৭ শতাংশ অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক-কার্গো ট্রাক-সেনাবাহিনীর গাড়ি-পুলিশ ভ্যান-ট্যাংকার ২৯.০৫ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ১১.৩৮ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ ৩.৭৫ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৪.০ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা) ১৮.৪০ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-টমটম-মাহিন্দ্র) ৫.০৮ শতাংশ, বাইসাইকেল-রিকশা ১.৯৩% এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৬.২৯ শতাংশ।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ছিল মোট ৮২৬টি। এর মধ্যে বাস ৯৪টি, ট্রাক ১৩৮টি, কাভার্ডভ্যান ১৩টি, পিকআপ ২৪টি, ট্রাক্টর ২৯টি, ট্রলি ৬টি, লরি ৯টি, ড্রাম ট্রাক ১২টি এবং কার্গো ট্রাক ৪টি রয়েছে। এ ছাড়া সেনা বাহিনীর গাড়ি ১টি, পুলিশ ভ্যান ২টি এবং ট্যাংকার ২টি দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল। এ ছাড়া মাইক্রোবাস ১৪টি, প্রাইভেটকার ১২টি, অ্যাম্বুলেন্স ৩টি ও জিপ ২টি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। মোটরসাইকেল ১৯৯টি এবং থ্রি-হুইলার ১৫২টি (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা, অটোভ্যান ও লেগুনা) দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল। স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৪২টি (নসিমন, ভটভটি, আলমসাধু, টমটম ও মাহিন্দ্র), বাইসাইকেল ৭টি ও রিকশা ৯টি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। এ ছাড়া ৫২টি অজ্ঞাত যানবাহনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৫.৬০ শতাংশ, সকালে ২২.৪৩ শতাংশ, দুপুরে ২০.১১ শতাংশ, বিকেলে ১৫.৪৭ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১৬.৬৩ শতাংশ এবং রাতে ১৯.৭২ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং প্রাণহানি ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৪ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং প্রাণহানি ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং প্রাণহানি ১৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ ও প্রাণহানি ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ ও প্রাণহানি ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ও প্রাণহানি ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ ও প্রাণহানি ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও প্রাণহানি ৬ শতাংশ।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১২২টি দুর্ঘটনায় ১০৯ জন নিহত হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ২৮টি দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৩২টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়েছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, পুলিশ সদস্য ১ জন, শিক্ষক ১১ জন, সাংবাদিক ৪ জন, আইনজীবী ৩ জন, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১৪ জন, এনজিও কর্মী ১৭ জন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ৩৪ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৩ জন, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৯ জন, পোশাক শ্রমিক ৬ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৪ জন, প্রতিবন্ধী ২ জন এবং ৬১ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা অন্যতম। এ ছাড়া চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতাও দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
দুর্ঘটনা কমাতে সংগঠনটি কয়েকটি সুপারিশও করেছে। এর মধ্যে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা এবং বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্ব রাস্তা বা সার্ভিস রোড তৈরি করা এবং পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, রেল ও নৌপথ সংস্কার করে সড়কপথের ওপর চাপ কমানো, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাধাহীনভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
গত জানুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৫.৭০ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছে ১৫.৪২ জন। এই হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমেছে ১.৭৮ শতাংশ। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমার এই হার কোনো টেকসই উন্নতির সূচক নির্দেশ করছে না। কারণ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই।
অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ দরকার। যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এজন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে, নিয়োগপত্র, বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকার যানবাহনের অধিকাংশ চালক শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তারা সবসময় অস্বাভাবিক আচরণ করেন এবং বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালান। ফলে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন। তাই, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে পরিবহন শ্রমিকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা এবং সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।