Dhaka সোমবার, ০৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২২ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নিষিদ্ধ কোনো দল অংশ না নিতে পারা নির্বাচনের পথে বাধা নয় : নজরুল ইসলাম খান

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল আছে যাদের প্রতি জনগণ ক্ষুব্ধ ও ক্রোধ আছে। দেশের প্রচলিত আইনে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আছে। তাই তাদের আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ নাই। এটাকে নির্বাচনের পথে বাধা মনে করা যায় না।

রোববার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপির নির্বাচনি কার্যালয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন।

আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, এক সময় অনেক দল যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই তখনও নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক বলা হতো। আমরা ওইভাবে বলতে চাই না। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দল আছে যাদের প্রতি জনগণের খুব ও ক্রোধ আছে। দেশের প্রচলিত আইনে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। তাই তাদের আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ নাই। এটাকে নির্বাচনের পথে বাধা মনে করা যায় না। এর বাইরে কোনো দল যদি অংশগ্রহণ করতে না চায় তাহলে সেটা ভিন্ন কথা।

তিনি বলেন, এই মুহূর্তে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে যাদের রাজনৈতিক তৎপরতার উপর বিধিনিষেধ নাই তাদের কারোরই নির্বাচনের অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে বাধা নেই। এখন এটা তাদের সিদ্ধান্ত। যদি বাধা হতো তাহলে আমরা বলতে পারতাম নির্বাচনের কিছু দলকে বাইরে রেখে আয়োজনের চেষ্টা হচ্ছে। বাধা না থাকার কারণে এটা আমরা বলতে পারছি না। এখন কোনো দল যদি স্বেচ্ছায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে সেখানে কারো কিছু বলার নাই।

আওয়ামী লীগ আমলের দীর্ঘ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে গুম-খুনের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে বিএনপি, সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত হয়েছে বিএনপি, সবচেয়ে বেশি গায়েবি মামলার শিকার হয়েছে বিএনপি এবং তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারপরও আমরা রাজপথ থেকে কখনো পেছনে যাইনি। আমরা তবুও রাজপথে ছিলাম। ২৪ এর ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানেও আমরা সক্রিয় ছিলাম।

তিনি বলেন, যে লড়াইটা আমরা শুরু করেছিলাম, সে লড়াইয়ের সুষ্ঠু একটা পরিসমাপ্তির জন্যই আমরা কথা বলেছি ও কাজ করেছি আর সেটা হতে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচন আমাদের দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের, এই নির্বাচন আমাদের বহু কাঙ্ক্ষিত একটি নির্বাচন। বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ভোট দিতে পারেননি। পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেননি। আমরা আশা করছি এবার জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবে এবং তাদের পছন্দনীয় সরকার পাবে, যারা তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করবে।

আজকের বৈঠকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, কীভাবে আমাদের প্রার্থীদের সহযোগিতা করতে পারব, কীভাবে শান্তিপূর্ণ, অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে আমরা ভূমিকা পালন করতে পারব, কীভাবে ভোটারদের যথাসময়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হতে আমরা উদ্দীপ্ত করতে পারব এবং কীভাবে আমাদের দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিতে উৎসাহিত করতে পারব— এসব বিষয় আজ আমাদের আলোচনায় এসেছে।

এই বিষয়গুলো ঠিক করার জন্য উপকমিটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করবে জানিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, উনারা আমাদের পরামর্শ দেবেন এবং আমাদের প্রার্থীদের সহাযোগিতা করবেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বরাবর যথা সম্ভব দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দাবি জানিয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, কেউ কেউ অভিযোগ করেন, নির্বাচন হলেই বিএনপি ক্ষমতায় যাবে, সেজন্য বিএনপি তাড়াতাড়ি নির্বাচন চায়। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে অবশ্যই বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেই কারণে আমরা নির্বাচন চাইনি। আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে স্বৈরাচারী সরকার যেটা পরে ফ্যাসিবাদী সরকারে পরিণত হয়েছে, সে সরকারের পতন চেয়েছি, দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চেয়েছি।

তিনি আরও বলেন, আমরা যে এক দফা আন্দোলন করেছি, সেটা ছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় করতে পেরেছি, কিন্তু দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা শুধু একটা অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে, জনগণের ভোটের মাধ্যেম, জনগণের সমর্থনের দ্বারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হতে পারে। সেজন্যই আমরা বারবার নির্বাচনের কথা বলেছি।

বিএনপির পূর্বের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, আমরা এক দলীয় বাকশাল শাসনের অবসান করে বহুদলীয় গণতন্ত্র পেয়েছি আমাদের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। এরপরে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বৈঠকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, নবগঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সাথে পরিচিত হওয়া এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতেই এই সভা। নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করা হবে এবং প্রতিটি টিমে নির্দিষ্ট লিডার থাকবেন। এই কমিটিগুলো মূলত দলীয় প্রার্থীদের আইনি ও সাংগঠনিক সহযোগিতা প্রদান এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করবে।

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু গণতন্ত্র এখনও পূর্ণতা পায়নি। এর জন্য প্রয়োজন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। বিএনপি শুরু থেকেই এই নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকে বিএনপিই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও গায়েবি মামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু রাজপথ ছেড়ে যায়নি।

বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ভোট দিতে পারেনি উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা আশা করছি জনগণ এবার তাদের পছন্দনীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে। আমাদের নেতা তারেক রহমান বারবার শান্তির কথা বলেছেন। আমরা চাই মানুষ যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে এবং কল্যাণমুখী একটি সরকার গঠিত হয়।

মনোনয়ন বাতিল হওয়া নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যদি ন্যায্য কারণে কারো মনোনয়নপত্র বাতিল হয় তাহলে কাউকে দোষারোপ করতে পারেন না। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাতিল হলে সেটা হতেই পারে। আমাদের বিএনপি প্রার্থীরও মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। তো মনোনয়নপত্র বাতিল হলে আপিল করার সুযোগ আছে। প্রার্থীরা নিশ্চয়ই সে অনুযায়ী আপত্তি জানাবেন এবং সেই সময় আছে।

একটি দলের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের ভোটার আইডি সংগ্রহ করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে কিনা- জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, কোনো দলের পক্ষ ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু ভোটারদের জাতীয় পরিচয় পত্র সংগ্রহ করা সেখানে দুশ্চিন্তার কারণ থাকতে পারে। সেটার প্রয়োজন টা কী? এটা পত্রিকায় নিউজ হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে নিউজ করা উচিত। সরকারের উচিত এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ব্যক্তিগত ডকুমেন্ট। যেকোনোভাবে সেগুলো সংগ্রহের মাধ্যমে কোনো মন্দ উদ্দেশ্য থাকতেই পারে। অতএব সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করি।

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে কোথাও কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের জন্য বলা হয়নি। আর বললেই তারা করবে কেন? তাদেরও করার কথা না। কারণ তারা তো সরকারি কর্মকর্তা। তারা আমাদের দলের কর্মী নন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কি লেখা হয়েছে, সেটা নিয়ে কাউকে অভিযুক্ত করা মনে হয় সংগত নয়।

এসময় তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামীতে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। এ সময় তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের কথা, কাজ বা আকাঙ্ক্ষা— কোনোটাই জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।

নজরুল ইসলাম খান আরও বলেন, আমরা আপনাদের কাছে স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমাদের নেতা তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে বিশাল গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যে বক্তৃতা দিয়েছেন, আপনারা শুনেছেন। বারবার তিনি শান্তির কথা বলেছেন। বারবার তিনি সমঝোতার কথা বলেছেন। আমরা একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আশা করি। একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে যে ভূমিকা পালন করা দরকার, বিএনপি তাই করবে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সেই লক্ষ্যকে ধারণ করেই তারা কাজ করবে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, বিএনপি বরাবর অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলেছে। সেজন্যই আমাদের দল এবং দল কর্তৃক গঠিত এই নির্বাচন পরিচালনা কমিটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যই কাজ করবে। আমরা সেটার জন্যই কাজ করব। আমরা এই কাজে আপনাদের সহযোগিতা চাই। আপনারা বরাবর আমাদের কথা জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, এখনো আপনারা সেটা করবেন বলে আমরা আশা করি।

তিনি বলেন, অনেকদিন আপনারা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক কথা বলতে পারেননি, সবকিছু প্রকাশ করতে পারেননি। কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি ভিন্ন। আপনারা তো পারছেন সেটা করতে। আমরা আশা করব আপনারা আপনাদের বিবেক দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, অভিজ্ঞতা দিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহযোগিতা করবেন।

এ দেশের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, বারবার গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, মানুষ গুম হয়েছে, খুন হয়েছে, নিপীড়িত হয়েছে, নিগৃহীত হয়েছে, পালিয়ে বেড়িয়েছে। আজকে সবার সামনে একটা চমৎকার সম্ভাবনার সুযোগ এসেছে। এই সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই।

তিনি আরও বলেন, আমরা উন্মুক্ত থাকতে চাই। আমাদের কথায় বা কাজে আমরা কিছু গোপন রাখতে চাই না। আমরা মনে করি জনগণ সবকিছু বুঝেই যদি ভালো বোঝে, তাহলে আমাদের পছন্দ করবে, আমাদের সমর্থন করবে। আর সেইভাবে যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলেই শুধু আমরা জনগণের সহযোগিতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারব। আমাদের সেই সৎ সাহস আছে যে, আমাদের কোনো কৌশল নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা কখনো এমন কোনো কৌশল নেয়নি, যেখানে তার মর্যাদা বা পরিচয় গোপন রাখতে হয়েছে, এখনো রাখতে হবে না ইনশাআল্লাহ।

এদিন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন, কমিটির প্রধান সমন্বয়ক মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, মুখপাত্র মাহাদি আমিন, সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার, সাইমুম পারভেজ প্রমুখ।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রার্থী বৈধতা পেলেও অভিযোগ নেবে ইসি

নিষিদ্ধ কোনো দল অংশ না নিতে পারা নির্বাচনের পথে বাধা নয় : নজরুল ইসলাম খান

প্রকাশের সময় : ০৯:০১:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল আছে যাদের প্রতি জনগণ ক্ষুব্ধ ও ক্রোধ আছে। দেশের প্রচলিত আইনে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আছে। তাই তাদের আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ নাই। এটাকে নির্বাচনের পথে বাধা মনে করা যায় না।

রোববার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপির নির্বাচনি কার্যালয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন।

আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, এক সময় অনেক দল যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই তখনও নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক বলা হতো। আমরা ওইভাবে বলতে চাই না। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দল আছে যাদের প্রতি জনগণের খুব ও ক্রোধ আছে। দেশের প্রচলিত আইনে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। তাই তাদের আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ নাই। এটাকে নির্বাচনের পথে বাধা মনে করা যায় না। এর বাইরে কোনো দল যদি অংশগ্রহণ করতে না চায় তাহলে সেটা ভিন্ন কথা।

তিনি বলেন, এই মুহূর্তে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে যাদের রাজনৈতিক তৎপরতার উপর বিধিনিষেধ নাই তাদের কারোরই নির্বাচনের অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে বাধা নেই। এখন এটা তাদের সিদ্ধান্ত। যদি বাধা হতো তাহলে আমরা বলতে পারতাম নির্বাচনের কিছু দলকে বাইরে রেখে আয়োজনের চেষ্টা হচ্ছে। বাধা না থাকার কারণে এটা আমরা বলতে পারছি না। এখন কোনো দল যদি স্বেচ্ছায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে সেখানে কারো কিছু বলার নাই।

আওয়ামী লীগ আমলের দীর্ঘ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে গুম-খুনের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে বিএনপি, সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত হয়েছে বিএনপি, সবচেয়ে বেশি গায়েবি মামলার শিকার হয়েছে বিএনপি এবং তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারপরও আমরা রাজপথ থেকে কখনো পেছনে যাইনি। আমরা তবুও রাজপথে ছিলাম। ২৪ এর ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানেও আমরা সক্রিয় ছিলাম।

তিনি বলেন, যে লড়াইটা আমরা শুরু করেছিলাম, সে লড়াইয়ের সুষ্ঠু একটা পরিসমাপ্তির জন্যই আমরা কথা বলেছি ও কাজ করেছি আর সেটা হতে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচন আমাদের দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের, এই নির্বাচন আমাদের বহু কাঙ্ক্ষিত একটি নির্বাচন। বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ভোট দিতে পারেননি। পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেননি। আমরা আশা করছি এবার জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবে এবং তাদের পছন্দনীয় সরকার পাবে, যারা তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করবে।

আজকের বৈঠকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, কীভাবে আমাদের প্রার্থীদের সহযোগিতা করতে পারব, কীভাবে শান্তিপূর্ণ, অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে আমরা ভূমিকা পালন করতে পারব, কীভাবে ভোটারদের যথাসময়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হতে আমরা উদ্দীপ্ত করতে পারব এবং কীভাবে আমাদের দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিতে উৎসাহিত করতে পারব— এসব বিষয় আজ আমাদের আলোচনায় এসেছে।

এই বিষয়গুলো ঠিক করার জন্য উপকমিটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করবে জানিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, উনারা আমাদের পরামর্শ দেবেন এবং আমাদের প্রার্থীদের সহাযোগিতা করবেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বরাবর যথা সম্ভব দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দাবি জানিয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, কেউ কেউ অভিযোগ করেন, নির্বাচন হলেই বিএনপি ক্ষমতায় যাবে, সেজন্য বিএনপি তাড়াতাড়ি নির্বাচন চায়। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে অবশ্যই বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেই কারণে আমরা নির্বাচন চাইনি। আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে স্বৈরাচারী সরকার যেটা পরে ফ্যাসিবাদী সরকারে পরিণত হয়েছে, সে সরকারের পতন চেয়েছি, দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চেয়েছি।

তিনি আরও বলেন, আমরা যে এক দফা আন্দোলন করেছি, সেটা ছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় করতে পেরেছি, কিন্তু দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা শুধু একটা অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে, জনগণের ভোটের মাধ্যেম, জনগণের সমর্থনের দ্বারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হতে পারে। সেজন্যই আমরা বারবার নির্বাচনের কথা বলেছি।

বিএনপির পূর্বের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, আমরা এক দলীয় বাকশাল শাসনের অবসান করে বহুদলীয় গণতন্ত্র পেয়েছি আমাদের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। এরপরে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বৈঠকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, নবগঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সাথে পরিচিত হওয়া এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতেই এই সভা। নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করা হবে এবং প্রতিটি টিমে নির্দিষ্ট লিডার থাকবেন। এই কমিটিগুলো মূলত দলীয় প্রার্থীদের আইনি ও সাংগঠনিক সহযোগিতা প্রদান এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করবে।

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু গণতন্ত্র এখনও পূর্ণতা পায়নি। এর জন্য প্রয়োজন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। বিএনপি শুরু থেকেই এই নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকে বিএনপিই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও গায়েবি মামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু রাজপথ ছেড়ে যায়নি।

বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ভোট দিতে পারেনি উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা আশা করছি জনগণ এবার তাদের পছন্দনীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে। আমাদের নেতা তারেক রহমান বারবার শান্তির কথা বলেছেন। আমরা চাই মানুষ যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে এবং কল্যাণমুখী একটি সরকার গঠিত হয়।

মনোনয়ন বাতিল হওয়া নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যদি ন্যায্য কারণে কারো মনোনয়নপত্র বাতিল হয় তাহলে কাউকে দোষারোপ করতে পারেন না। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাতিল হলে সেটা হতেই পারে। আমাদের বিএনপি প্রার্থীরও মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। তো মনোনয়নপত্র বাতিল হলে আপিল করার সুযোগ আছে। প্রার্থীরা নিশ্চয়ই সে অনুযায়ী আপত্তি জানাবেন এবং সেই সময় আছে।

একটি দলের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের ভোটার আইডি সংগ্রহ করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে কিনা- জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, কোনো দলের পক্ষ ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু ভোটারদের জাতীয় পরিচয় পত্র সংগ্রহ করা সেখানে দুশ্চিন্তার কারণ থাকতে পারে। সেটার প্রয়োজন টা কী? এটা পত্রিকায় নিউজ হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে নিউজ করা উচিত। সরকারের উচিত এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ব্যক্তিগত ডকুমেন্ট। যেকোনোভাবে সেগুলো সংগ্রহের মাধ্যমে কোনো মন্দ উদ্দেশ্য থাকতেই পারে। অতএব সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করি।

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে কোথাও কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের জন্য বলা হয়নি। আর বললেই তারা করবে কেন? তাদেরও করার কথা না। কারণ তারা তো সরকারি কর্মকর্তা। তারা আমাদের দলের কর্মী নন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কি লেখা হয়েছে, সেটা নিয়ে কাউকে অভিযুক্ত করা মনে হয় সংগত নয়।

এসময় তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামীতে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। এ সময় তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের কথা, কাজ বা আকাঙ্ক্ষা— কোনোটাই জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।

নজরুল ইসলাম খান আরও বলেন, আমরা আপনাদের কাছে স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমাদের নেতা তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে বিশাল গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যে বক্তৃতা দিয়েছেন, আপনারা শুনেছেন। বারবার তিনি শান্তির কথা বলেছেন। বারবার তিনি সমঝোতার কথা বলেছেন। আমরা একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আশা করি। একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে যে ভূমিকা পালন করা দরকার, বিএনপি তাই করবে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সেই লক্ষ্যকে ধারণ করেই তারা কাজ করবে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, বিএনপি বরাবর অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলেছে। সেজন্যই আমাদের দল এবং দল কর্তৃক গঠিত এই নির্বাচন পরিচালনা কমিটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যই কাজ করবে। আমরা সেটার জন্যই কাজ করব। আমরা এই কাজে আপনাদের সহযোগিতা চাই। আপনারা বরাবর আমাদের কথা জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, এখনো আপনারা সেটা করবেন বলে আমরা আশা করি।

তিনি বলেন, অনেকদিন আপনারা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক কথা বলতে পারেননি, সবকিছু প্রকাশ করতে পারেননি। কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি ভিন্ন। আপনারা তো পারছেন সেটা করতে। আমরা আশা করব আপনারা আপনাদের বিবেক দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, অভিজ্ঞতা দিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহযোগিতা করবেন।

এ দেশের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, বারবার গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, মানুষ গুম হয়েছে, খুন হয়েছে, নিপীড়িত হয়েছে, নিগৃহীত হয়েছে, পালিয়ে বেড়িয়েছে। আজকে সবার সামনে একটা চমৎকার সম্ভাবনার সুযোগ এসেছে। এই সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই।

তিনি আরও বলেন, আমরা উন্মুক্ত থাকতে চাই। আমাদের কথায় বা কাজে আমরা কিছু গোপন রাখতে চাই না। আমরা মনে করি জনগণ সবকিছু বুঝেই যদি ভালো বোঝে, তাহলে আমাদের পছন্দ করবে, আমাদের সমর্থন করবে। আর সেইভাবে যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলেই শুধু আমরা জনগণের সহযোগিতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারব। আমাদের সেই সৎ সাহস আছে যে, আমাদের কোনো কৌশল নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা কখনো এমন কোনো কৌশল নেয়নি, যেখানে তার মর্যাদা বা পরিচয় গোপন রাখতে হয়েছে, এখনো রাখতে হবে না ইনশাআল্লাহ।

এদিন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন, কমিটির প্রধান সমন্বয়ক মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, মুখপাত্র মাহাদি আমিন, সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার, সাইমুম পারভেজ প্রমুখ।