টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি :
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বহু কষ্টে, অনেক রক্ত দিয়ে আমরা পুনরায় স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ১২ তারিখের নির্বাচন শুধু নির্বাচন হলে চলবে না, নির্বাচনটি হতে হবে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের দিন। গত ৫ আগস্ট যেভাবে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, সেভাবে ১২ তারিখে ভোট দিতে হবে। যদি ১২ তারিখের ভোটে গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা না করি, তাহলে গণতন্ত্র আবার বাধাগ্রস্ত হবে। ভোটের আগের দিন থেকে ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় যমুনা সেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে টাঙ্গাইলের দরুন-চরজানা বাইপাস এলাকার খোলা মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছর যারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তাদের দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে দেশের প্রতিটি মানুষকে ৫ আগস্টের মতো রাজপথে ও ভোটকেন্দ্রে সক্রিয় হতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, আগামী দিনের রাজনীতি হবে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের। আগামী দিনের রাজনীতি হবে দেশের উন্নয়নের। এ দেশ কোনো দলের না, কারো ব্যক্তিগত না। এই দেশ লাখোকোটি মানুষের। এদেশের মালিক এই দেশের জনগণ। কাজেই সবার আগে বাংলাদেশ।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন কোনো ষড়যন্ত্র করে কেউ আবার এই ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে। এই মুহূর্তে বিএনপি একমাত্র রাজনৈতিক দল, যেই দলের অভিজ্ঞতা আছে- কীভাবে দেশকে সুন্দরভাবে সামনের দিকে পরিচালিত করতে হয়। বাংলাদেশের মালিক এই দেশের জনগন। ১২ তারিখে জনগন সিদ্ধান্ত নিবে বাংলাদেশ কীভাবে চলবে। আল্লাহ চাইলে ভোটের পর ১৩ তারিখ থেকে দেশ গড়ার কাজ শুরু করবো।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালে বাক্সের ম্যাজিক দেখানো হয়েছিল। রেজাল্ট পাল্টে দেওয়া হয়েছিল। এবার যাতে রেজাল্ট পাল্টাতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এখনো কোন কোন মহল চেষ্টা করছে কিভাবে ভোটকে বাধাগ্রস্ত করা যায়। তাদের বিভিন্ন লোকজন দিয়ে মা-বোনদের এনআইডি ও বিকাশ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এভাবে তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, গত ১৫/১৬ বছর আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে আনাচে কানাচে, মানুষ বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়েছে। এলাকার উন্নয়ন থেকে, মানুষের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতি হয়েছে। আমরা গুম দেখেছি, মিথ্যা মামলা দেখেছি, গায়েবি মামলা দেখেছি। এই অবস্থার পরিবর্তন যদি করতে হয় ৫ আগস্ট যেমন বাংলাদেশের জনগণ দলমত নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে এসেছিল। ঠিক একইভাবে আগামী ১২ তারিখে নির্বাচনে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, আমরা যদি ৫ তারিখের সেই পরিবর্তন চালু রাখতে না পারি, ভোট দিয়ে যদি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে না পারি তাহলে যে গণতন্ত্রের ভিত্তি রচনা করতে চাচ্ছি, যে গণতন্ত্র সুশাসন নিশ্চিত করবে, যে গণতন্ত্র মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন করবে, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করবে সেই গণতন্ত্র আবার বাধাগ্রস্ত করবে।
মা-বোনদের স্বাবলম্বী করতে হবে জানিয়ে নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মা-বোনদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। পর্যায়ক্রমে তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াতে চাই। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত। যদি কৃষক ভালো থাকে তাহলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। এজন্য কৃষকদের আমরা কৃষক কার্ড দিতে চাই। কৃষি লোন ১০ হাজার পর্যন্ত সুদসহ মওকুফ করতে চাই।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, মসজিদের মুয়াজ্জিন, ইমাম, খতিব অন্য ধর্মীয় মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক সম্মানীর ব্যবস্থা করতে চাই। প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। দেশ কিভাবে গঠিত হবে সেই পরিকল্পনা আপনাদের সঙ্গে তুলে ধরলাম। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে চাই।
প্রতিপক্ষ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষ আছে তাদের সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারতাম। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে যদি বকাঝকা করি তাহলে আপনাদের কোন লাভ হবে না। বরং আমরা যারা নির্বাচন করছি তারা দেশের জন্য কি করবো সেটা আপনাদের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা। একটি রাজনৈতিক দলের এটাই হচ্ছে কাজ, জনগণের জন্য তারা আগামী দিনে সুযোগ পেলে তারা কি কি কাজ করবে-সেটাই তুলে ধরা। আজকে আপনাদের সামনে আমি সেই কথাগুলোই তুলে ধরলাম। পরিকল্পনা সব আপনাদের সামনে। বাস্তবায়নের শক্তিও আপনাদের সামনে। অর্থাৎ আপনারা ধানের শীষকে ১২ তারিখে বিজয় করলে ১৩ তারিখ থেকে আমরা কাজগুলো করবো।
টাঙ্গাইলের স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের গর্ব। গার্মেন্টস পণ্যের মতো টাঙ্গাইলের শাড়িও যেন বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা যায়, সে উদ্যোগ নেবে বিএনপি। টাঙ্গাইলকে একটি পরিকল্পিত শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, এ অঞ্চলে উৎপাদিত আনারস প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করা হবে এবং ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে আধুনিক পরিকল্পনার আওতায় এনে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।
টাঙ্গাইলে যমুনা নদীতে ব্যারেজ নির্মাণ, জুস প্রক্রিয়াজাত করাসহ বিভিন্ন কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি তারেক রহমান পাট শিল্পকে জাগানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা যদি সকলে মিলে কাজ করি, সকলে মিলে যদি পরিকল্পনা গ্রহণ করি ইনশাল্লাহ তাহলে অবশ্যই শুধু টাঙ্গাইল নয় আমাদের সারা বাংলাদেশে আমরা আমাদের কাঙ্খিত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হব। কিন্তু এই পরিবর্তন যদি আনতে হয় তাহলে অবশ্যই এই দেশের মালিক যারা এই জনগণকে আমাদের সাথে থাকতে হবে। কারণ মালিক ছাড়াতো কোনো কাজ করা যাবে না। এই দেশের মালিক আপনারা যদি বিএনপির পাশে থাকেন, এই দেশের মালিক জনগণ আপনারা যদি বিএনপিকে সমর্থন দেন, এই দেশের মালিক জনগণ আপনারা যদি বিএনপিকে সামনে এগিয়ে দেন তাহলে ইনশাল্লাহ বিএনপি ধীরে ধীরে এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হব।
টাঙ্গাইলের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের প্রার্থীরা আপনাদের সামনে তাদের নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করেছেন। ১২ তারিখে আপনারা ধানের শীষকে নির্বাচিত করলে ইনশাল্লাহ ১৩ তারিখে ধানের শীষ তথা বিএনপির সরকার গঠিত হলে আপনাদের এলাকার যে দাবিগুলো আছে পর্যায়ক্রমিকভাবে সেই উন্নয়নমূলক কাজগুলো আমরা শুরু করব। এই টাঙ্গাইল অঞ্চল এই টাঙ্গাইল অঞ্চল একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। এই টাঙ্গাইলের শাড়ি আছে। বিভিন্ন রং ডিজাইনের শাড়ি আছে। এই শাড়িকে আমরা যদি চেষ্টা করি পরিকল্পিতভাবে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করি বাংলাদেশের গার্মেন্টসের জামা কাপড় যেরকম বিদেশে পাওয়া যায় এই শাড়িকেও আমরা একইভাবে বিদেশে রপ্তানি করতে পারব। এই টাঙ্গাইল থেকে টুপি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যায়। এই যে নামাজ পড়ি নামাজ পড়ার সময় যে টুপি এই টাঙ্গাইলে তৈরি হয় এবং এই টুপি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যায়। আমরা যদি উদ্যোগ গ্রহণ করি এই টুপিতে যারা কাজ করে আরো বহু সংখ্যক মানুষ এখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। অর্থাৎ টাঙ্গাইলকে আমরা পরিকল্পিতভাবে একটু আগে টুকু (সালাউদ্দিন টুকু) যেই কথা বলল টাঙ্গাইলকে পরিকল্পিতভাবে আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে শিল্পের শহরে পরিণত করতে পারব।

সরকার গঠন করলে বিএনপির ভবিষ্যৎ জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি ঘোষণা করে তারেক রহমান বলেন, দেশের মা-বোনদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে গৃহিণীদের মাসিক আর্থিক সহায়তা এবং কৃষকদের বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ করা হবে। এছাড়া ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক মর্যাদার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আলেম-ওলামা, খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্য ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য সরকারি বিশেষ সম্মানীর ব্যবস্থা করা হবে।
ভোটের সুরক্ষা নিয়ে দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। এখনো কেউ কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
বিশেষ করে নারী ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে যাবেন। প্রয়োজনে জামাতে নামাজ পড়ে লাইনে দাঁড়াবেন। ভোট দিয়ে চলে গেলেই হবে না, ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে—যেন কেউ আপনার ভোট অন্যভাবে ব্যবহার করতে না পারে।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, গত কয়েক বছরে মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি হয়েছে। এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। মনে রাখতে হবে, এ দেশ কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয় এ দেশ জনগণের।
জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার পর তারেক রহমান টাঙ্গাইলের আটটি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব জনগণের কাছে অর্পণ করেন।
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তৃতা দেন- টাঙ্গাইল-১ আসনের দলীয় প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম, টাঙ্গাইল-২ আসনের আব্দুস সালাম পিন্টু, টাঙ্গাইল-৩ আসনের ওবায়দুল হক, টাঙ্গাইল-৪ আসনের লুৎফর রহমান মতিন, টাঙ্গাইল-৫ আসনের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু,টাঙ্গাইল -৬ আসনের রবিউল আওয়াল লাভলু, টাঙ্গাইল-৭ আসনের আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, টাঙ্গাইল-৮ আসনের আহমেদ আযম খান, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু।
টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি 



















