নিজস্ব প্রতিবেদক :
সদ্য চালু হওয়া ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) সিস্টেমে দেশজুড়ে ক্লোন ও নকল মোবাইল ফোন ব্যবহারের এক উদ্বেগজনক চিত্র ধরা পড়েছে। এতে দেখা গেছে, বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোতে লাখ লাখ ভুয়া ও ডুপ্লিকেট আইএমইআই (IMEI) নম্বর সক্রিয় রয়েছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শনিবার (০৩ জানুয়ারি) জানানো হয়, এনইআইআর সিস্টেমে দেশজুড়ে অসংখ্য অস্বাভাবিক আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ‘১১১১১১১১১১১১১’, ‘০০০০০০০০০০০০০’ এবং ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ এর মতো ভুয়া আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে লাখ লাখ হ্যান্ডসেট সচল থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ক্লোন ও নকল হ্যান্ডসেট বন্ধে গত ১ জানুয়ারি থেকে বহুল প্রতীক্ষিত এনইআইআর (NEIR) সিস্টেম চালু করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এই ব্যবস্থা চালুর পরপরই জালিয়াতির এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এল।
তবে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ব্যবহারকারীদের অসুবিধার কথা চিন্তা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনই এই ফোনগুলো বন্ধ করছে না। জনজীবন যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য এসব আইএমইআই নম্বরকে বর্তমানে ‘গ্রে’ বা ধূসর তালিকায় রাখা হচ্ছে।
আইএমইআই হলো প্রতিটি মোবাইল ফোন এবং সিম ব্যবহার করা যায় এমন ডিভাইসের একটি বিশেষ পরিচয় নম্বর। সাধারণত ১৫ ডিজিটের এই নম্বর হ্যান্ডসেটের আঙুলের ছাপের মতো কাজ করে। এর মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও কর্তৃপক্ষ সিম কার্ড ছাড়াই হ্যান্ডসেটটিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ নিম্নমানের ও নকল হ্যান্ডসেট ব্যবহার করছেন। এসব ফোন আমদানির সময় কোনো ধরনের নিরাপত্তা পরীক্ষা, ফোনে ক্ষতিকর বিকিরণ বা রেডিয়েশন এবং স্পেসিফিক অ্যাবসর্পশন রেট (এসএআর) টেস্ট করা হয়নি। দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কজুড়েই এমন অনিবন্ধিত ও নিম্নমানের ফোনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেবল ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি সংযোগ সচল করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভুয়া আইএমইআই নম্বরগুলো শুধু স্মার্টফোনে নয় বরং বিভিন্ন ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ডিভাইসেও থাকতে পারে। বর্তমানে মোবাইল অপারেটররা মোবাইল ফোন, সিম-চালিত অন্যান্য ডিভাইস এবং আইওটি ডিভাইসের আইএমইআই আলাদাভাবে চিনতে পারে না। এর ফলে সিসিটিভি ক্যামেরার মতো ডিভাইসগুলোও একই আইএমইআই নম্বরের অধীনে সচল থাকতে পারে।
এই সমস্যা সমাধানে সরকার এখন থেকে বৈধভাবে আমদানিকৃত আইওটি ডিভাইসগুলোকে আলাদাভাবে ট্যাগ বা চিহ্নিত করা শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এমন কিছু ভুয়া ও নকল আইএমইআই নম্বরের তালিকা করেছে, যেগুলোর একেকটি নম্বর ব্যবহার করেই ১ লাখের বেশি মোবাইল ফোন চলছে। এই তথ্য থেকেই বোঝা যায়, দেশে মোবাইল জালিয়াতির শিকড় কতটা গভীরে এবং এটি কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বরগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু ভুয়া নম্বর দিয়েই দেশের বিশাল সংখ্যক মোবাইল ফোন চলছে। যেমন— ‘৪৪০০১৫২০২০০০’ আইএমইআই নম্বরটি ব্যবহার করে সচল আছে ১৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮টি ডিভাইস। এছাড়া ‘৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪’ নম্বরের বিপরীতে ১৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৪৮টি এবং ‘৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬’ নম্বরের বিপরীতে ১৫ লাখ ২৩ হাজার ৫৭১টি ফোন সক্রিয় রয়েছে। এমনকি কেবল একটি শূন্য ‘০’ আইএমইআই নম্বরে চলছে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি ডিভাইস। তালিকায় থাকা অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নম্বরগুলোর মধ্যে ‘৩৫৪৬৪৮০২০০০০২৫’ আইএমইআই নম্বরে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪৮টি, ‘৩৫৮৬৮৮০০০০০০০১৫’ নম্বরে ৫ লাখ ৩২ হাজার ৮৬৭টি এবং ‘৮৬৭৪০০০২০৩১৬৬১’ নম্বরে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১৭টি ডিভাইস চলছে। এছাড়া ‘৮৬৭৪০০০২০৩১৬৬২’ নম্বরের বিপরীতে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৮১৪টি, ‘১৩৫৭৯০২৪৬৮১১২২’ নম্বরে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৭টি এবং ‘৩৫২১০৮০১০০০২৩০’ নম্বরের বিপরীতে ২ লাখ ১৩ হাজার ৭৮৯টি ডিভাইস সচল পাওয়া গেছে। তালিকার ১৫১৫১৫১৫১৫১৫১৫ নম্বরটি ব্যবহৃত হচ্ছে ২ লাখ ১০ হাজার ৩৭টি ডিভাইসে। এর পরেই আছে ৩৫৯৭৫৯০০২৫১৪৯৩ নম্বরটি, যা সক্রিয় আছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৮২টি ডিভাইসে। এছাড়া ৩৫৮৬৮৮০০০০৯৩৮৫ নম্বরটি ১ লাখ ৯০ হাজার ৩৯৩টি এবং ৩৫৫০৫০০২০৯৮৪৫১ নম্বরটি ১ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬০টি ডিভাইসে সচল রয়েছে।
তালিকায় আরও দেখা যায়, ৩৫৯৪৫৪৭৮৪৯৮১৮৮ নম্বরটি ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৫৬টি ডিভাইসে এবং ৩৫৪৬৪৮০২০০০০০০ নম্বরটি ১ লাখ ৫০ হাজার ৫৪৬টি ডিভাইসে ব্যবহৃত হচ্ছে। ৩৫৩৯১৯০২৫৬৮০১৩ নম্বরটি সক্রিয় আছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫টি ডিভাইসে। ৩৫৯৭৩৮০০৯৫৫৩৪০ নম্বরটি ১ লাখ ২৭ হাজার ১৮৪টি এবং ৩৫৩২৫৯০৫৪৫৭৪৬৮ নম্বরটি ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৯৬টি ডিভাইসে সচল পাওয়া গেছে। এছাড়া ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০টি ডিভাইসে ৩৫৯৬৮৮০০০০০০১৫ নম্বর, ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৮১টি ডিভাইসে ৩৫৮২৭৩১১৭৩৮৬৩৪ নম্বর এবং ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৭১টি ডিভাইসে ৩৫৪৪৮৫০১৫৬৭২০৭ নম্বরটি সক্রিয় রয়েছে। তালিকার শেষ দিকে রয়েছে ৮৬৩০১৪০২০০০০০৫ এবং ৩৫৪১১২০৮০৬৪৪২৯ নম্বর দু’টি, যা যথাক্রমে ১ লাখ ৬ হাজার ৩১৪টি ও ১ লাখ ৩ হাজার ২৮১টি ডিভাইসে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, মোবাইল নেটওয়ার্কে বিপুল পরিমাণ ক্লোন বা নকল হ্যান্ডসেটের উপস্থিতির কারণেই এমন চিত্র দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোতে এনইআইআর সিস্টেমের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। কর্মকর্তারা বলেন, দেশের বাজারে ক্লোন ও নকল ফোনের অস্তিত্বের কথা আগে থেকেই জানা ছিল। তবে এই সমস্যার ব্যাপ্তি যে কতটা গভীর, তা এনইআইআর পদ্ধতি চালুর পরেই পুরোপুরি স্পষ্ট হয়েছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশই ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসের মাধ্যমে। এছাড়া, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ই-কেওয়াইসি (e-KYC) জালিয়াতির ৮৫ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে অবৈধ বা রিপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে। একই বছরে সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মোবাইল চুরির অভিযোগ জমা পড়লেও প্রকৃত সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেশি। চুরি হওয়া এসব ফোনের বেশিরভাগই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
কর্মকর্তারা বলছেন, ‘আনঅফিশিয়াল’ বা নতুন হ্যান্ডসেটের নামে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে নকল ফোন বিক্রি করা এক ধরনের নজিরবিহীন জালিয়াতি। জনস্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি বলে তারা জোর দাবি জানান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















