নিজস্ব প্রতিবেদক :
‘সবার আগে দেশ’ এই নীতিতে অটল থেকে যেকোনো মূল্যে দেশকে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন ও জননিরাপত্তায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে জনগণের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবার আগে ঠিক করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে থাকবে বিএনপি।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পল্লবী মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় এ কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা যতই পরিকল্পনা করি, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে না পারলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন দুরূহ হয়ে উঠবে। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি রোধ করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, এই দেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশের সন্তানরা পড়ালেখা শেষে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিজেদের ক্যারিয়ার গঠন করতে পারে। কাউকে যেন দুশ্চিন্তা করতে না হয়। দেশের নানা সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশ পুনর্গঠন ও দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার জন্য কাজ করছে বিএনপি। বিপক্ষ দলের সমালোচনা করলে, গিবত গাইলে জনগণের কোনো লাভ হবে না।
তিনি বলেন, সরকার গঠন করতে পারলে নারীদের স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে। কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষকদের কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে। এ সময় পল্লবীতে মানুষদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল করার ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
ক্ষমতায় গেলে বিএনপি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিখ্যাত খাল খনন কর্মসূচি আবারও শুরু করবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ঢাকা মহানগরীতে জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য যেখানে যেখানে যতগুলো খাল প্রয়োজন, সেগুলো খনন করা হবে।
তারেক রহমান বলেন, সরকার গঠন করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র বাংলাদেশে এই খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হবে। এতে জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবে।
তিনি বলেন, স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় এক হাজার চারশ মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে এবং প্রায় বিশ হাজার মানুষকে আহত করেছে।
গত ১৭ বছরে অধিকার আদায়ের জন্য কেউ জীবন দিয়েছে কেউ পঙ্গুত্ববরণ করেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ তাদের মতামত তুলে ধরতে চায় এবং অধিকার প্রয়োগ করতে চায়।
তিনি বলেন, আমাদের সামনে বিশাল বড় কাজ রয়েছে। ১২ তারিখে আমরা নির্ধারণ করব, কাদের দিয়ে দেশ পরিচালনা করব। আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কে নানা কথা বলতে পারি, কিন্তু তাতে জনগণের কোনো লাভ হবে না। আমাদের পরবর্তী ধাপ ও সামনের লক্ষ্য হলো দেশকে পুনর্গঠন করা এবং মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আজকে এই জনসভায় দাঁড়িয়ে আপনাদের সামনে হয়তো আমি আমাদের যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, তাদের সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারতাম। তাদের সম্পর্কে হয়তো আমি অনেক গিবত গাইতে পারতাম। কিন্তু আমি যদি প্রতিপক্ষ সম্পর্কে বা কারো সম্পর্কে যাই বলি না কেন তাতে কি জনগণের কোনো লাভ হবে? জনগণের কোনো লাভ হবে না।

তারেক রহমান বলেন, আজ সময় এসেছে দেশ এবং দেশের মানুষের আমাদেরকে ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হবে। সে কারণে আপনারা নিশ্চয়ই দুদিন আগে দেখেছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষ থেকে সমগ্র দেশের মানুষের সামনে আমরা আমাদের দলের মেনিফেস্টো উপস্থাপন করেছি।
‘সেখানে আমরা উল্লেখ করেছি নারীদেরকে কীভাবে সামনে এগিয়ে নিতে চাই। সেখানে আমরা ছাত্রদের লেখাপড়ার জন্য কী ব্যবস্থা করতে চাই? সেখানে আমরা উল্লেখ করেছি, কীভাবে আমরা বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। সেখানে আমরা উল্লেখ করেছি, কীভাবে আমাদের ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষ আছে সারা দেশে তাদের পাশে আমরা দাঁড়াতে চাই। সেখানে আমরা উল্লেখ করেছি যে, কীভাবে আমরা আমাদের কৃষক ভাইয়েরা যারা পরিশ্রম করে, আমাদের খাদ্যের যোগান দেন। সেই কৃষক ভাইদের পাশে আমরা দাঁড়াতে চাই। সেখানে আমরা সুন্দরভাবে উল্লেখ করেছি আপনাদের এলাকার সন্তান আমিনুল যেমন একজন প্রফেশনাল খেলোয়াড় শুধু আমিনুল একা কেন হবে? আমিনুলের মতো শত শত আমিনুল কীভাবে আমরা তৈরি করতে পারি দেশে সেটির উল্লেখ আমরা করেছি।’
আমাদের সামনে একটি বিশাল বড় কাজ আছে জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আগামী ১২ তারিখে আমাদেরকে সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। নির্বাচিত করতে হবে যে কাদের দিয়ে আমরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব করব। আমাদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়েছি যেখানে আমরা নিজেদের রায় দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। আজকে সময় এসেছে আমরা আন্দোলন করেছি, সংগ্রাম করেছি। আমাদের বহু সহকর্মীসহ অরাজনৈতিক বহু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে একযুগেরও বেশি সময় ধরে নির্যাতিত হয়েছেন, অত্যাচারিত হয়েছেন। নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমরা আমাদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত হয়েছি যেখানে আমরা নিজেদের রায় দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারব।
তিনি বলেন, পরবর্তী ধাপ হচ্ছে এই দেশকে পুনর্গঠন করা। এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। এটি হবে আমাদের একমাত্র সামনের লক্ষ্য। এটি হবে আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সেজন্য আসুন আজকে ধানের শীষের পক্ষ থেকে বিএনপির পক্ষ থেকে আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আজকে আমরা আপনাদের সামনে আমাদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি। আমরা বলেছি যে, আমরা আপনাদের সমর্থনে আল্লাহর রহমতে সরকার গঠনে সক্ষম হলে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যতবার দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি চেষ্টা করেছিলেন, ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন এই দেশের নারীরা যাতে শিক্ষিত হতে পারে এবং সেজন্যই স্কুল পর্যায় থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থা মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করেছিলেন। সমগ্র বাংলাদেশে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সেই পলিসির কারণে লক্ষ কোটি নারী আজ শিক্ষার আলোকিত হয়েছে। কিন্তু এই নারীদেরকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়তে তুলতে চাই। আজকে বাংলাদেশের টোটাল জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী মা-বোনেরা। তাদেরকে যদি আমরা স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে না পারি আমরা যতই পরিকল্পনা গ্রহণ করি না কেন? কেন দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা কোন কিছুতেই সফল হতে পারবো না।

‘একটু আগে আমি বলেছি যে, আমাদের কৃষক যদি ভালো থাকে, আমাদের দেশের মানুষ তাহলে ভালো থাকবে এবং সে কারণে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে আমরা সরকার গঠনে ইনশাল্লাহ আল্লাহর রহমতে আপনাদের দোয়ায়, আপনাদের সমর্থনে ১২ তারিখে সরকার গঠনে আমরা সক্ষম হলে আমরা এই কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াবো। মা-বোনদের হাতে যেভাবে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব, একইভাবে আমরা কৃষক ভাইদের কাছে কৃষি কার্ড নামে একটি কৃষক কার্ড পৌঁছে দিতে চাই, যার মাধ্যমে আমরা সরাসরি কৃষক ভাইদের কাছে তাদের প্রয়োজনীয় শস্য বীজ কৃষ্ণের সব প্রয়োজনীয় জিনিস যাতে আমরা পৌঁছে দিতে পারি এবং শুধু তাই নয় এর মধ্যে আমরা হিসাব নিকাশ করে দেখেছি যে আমাদের কৃষক ভাইদেরকে সহযোগিতা করার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি। এখানে বহু ভাই-বোন উপস্থিত আছেন যাদের পরিবারের কেউ না কেউ কোন না কোন গ্রামে বাস করছেন এবং কৃষি কার্যের সঙ্গে জড়িত আছেন অনেকে বিভিন্নভাবে কৃষি কার্যের সঙ্গে জড়িত। আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে বিএনপি ইনশাল্লাহ ১২ তারিখে সরকার গঠন করলে পরে সমগ্র বাংলাদেশে যত কৃষক ভাই আছে যাদের কৃষি ঋণ আছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত তাদের সেই কৃষি ঋণ আমরা সুদ সহ ইনশাআল্লাহ মৌকুফ করে দিব সরকারের পক্ষ থেকে।’
বিগত ১৬ বছরে মানুষের ভাগ্যের মেগা পরিবর্তন হয়নি মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ১৬ বছরে কীভাবে মেগা প্রজেক্ট হয়েছে, কিন্তু মানুষের ভাগ্যের মেগা পরিবর্তন হয়নি। আমরা দেখেছি মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে আমরা দেখেছি লাখ লাখ মানুষ কীভাবে রাজপথে নেমে এসেছিল উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, সেই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার এই দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। জনগণের গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনের মুখে সেই সময় তারা পালিয়ে যাওয়ার আগে ১৪০০ মতো মানুষকে তারা হত্যা করেছে, ২০ হাজারের মতো মানুষকে তারা বিভিন্নভাবে আহত করেছে। এই মানুষগুলোর যে আত্মত্যাগ, এই মানুষগুলোর যে যারা জীবন উৎসর্গ করেছে। এদের রক্ত কি কখনো বৃথা যেতে পারে? আমরা যারা বেঁচে আছি আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে আমরা কি কখনো এই তাদের এই ত্যাগ বৃথা যেতে দিতে পারি না। এজন্য আমাদের দুটো কাজ করতে হবে। একটি কাজ হচ্ছে যেই অধিকার আদায়ের জন্য ওই মানুষগুলো জীবন দিয়েছে, পুঙ্গুত্ব বরণ করেছে কেউ কেউ। সেই অধিকার আমাদের আদায় হওয়ার সময় হয়ে এসেছে। অর্থাৎ ১২ তারিখ যেই নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের মানুষ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করেছে।

যেকোনো মূল্যে ঢাকা শহরসহ সমগ্র বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা দেখেছি বিগত স্বৈরাচারের সময় কীভাবে উন্নয়নের নামে দেশ থেকে প্রতিবছর ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতি আমরা যত পরিকল্পনায় গ্রহণ করি না কেন, যদি আমরা দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে না পারি, তাহলে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করা অত্যন্ত দুর্বল ব্যাপার হয়ে যাবে। সেজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে কোনো আমাদের যত পরিকল্পনা আমরা করছি, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য, সেগুলো সুফল যাতে জনগণ পায়। তার জন্য আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। দুর্নীতির লাগাম ট্রেনে ধরতে হবে।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা-১৬ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্র দলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















