Dhaka শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তরুণ প্রজন্ম ছাত্র রাজনীতির নামে অপরাজনীতির সঙ্গে পরিচিত : শিক্ষা উপদেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

এখনকার তরুণ প্রজন্ম ছাত্র রাজনীতির নামে চরম অপরাজনীতির সঙ্গে পরিচিত বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

শনিবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবেস রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায়, বিশ্বিবদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ এবং ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের প্রধান।

তিনি বলেন, ‘ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। সমস্যা হলো এখনকার তরুণ প্রজন্ম ছাত্র রাজনীতির নামে চরম অপরাজনীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং দখলদারির রাজনীতির সাথেই শুধু পরিচিত। ছাত্রজীবনে আমিও রাজনীতি করেছি, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে ষাটের দশকের শেষের দিকে বিশ্বব্যাপী তরুণ সমাজের একটি নবজাগরণ হয়েছিল। অর্থনৈতিক, রাজেনৈতিক যত অব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র আন্দোলনের মুখেই অন্যায্য ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করতে আমেরিকা বাধ্য হয়। আমরাও ঢাকা বসে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ হোক সে দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম।’

শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের বায়ান্ন, উনসত্তর, নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের গৌরবময় ঐতিহ্য আছে। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের বড় অংশগ্রহণ ছিল। সর্বশেষ আমরা এখন ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান দেখলাম। ফলে অন্তর্বতী সরকার গঠিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা এবং সেই সাথে মুক্ত চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার স্বাধীনতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় শিক্ষার্থীরা ভোটার হিসেবে অবশ্যই রাজনীতির অংশ কিন্তু যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি আচরণবিধি নির্ধারিত থাকে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আমি আশা করবো নিজেদের প্রজ্ঞা দিয়ে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের নিজস্ব আচরণবিধি তৈরি করতে পারবে।’

অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অনেক নিচের দিকে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা শিক্ষকদের দাবি পূরণের চেষ্টা করবো। কিন্তু তাদের দায়িত্বের জায়গা থেকেও জবাবদিহিতা এবং নজরদারি থাকতে হবে।

শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, প্রতিদিন অতন্ত চার-পাঁচটা বড় বড় দাবি আমার কাছে আসে। কিন্তু তারপরও আমি বিরক্ত হই না। আমি নিজেকে অপরাধী মনে করি তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারি না বলে, নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাই। এদেশের পুরো শিক্ষকতা পেশা, বিশেষভাবে উল্লেখ করবো বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকরা অন্য সমতুল্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং উপেক্ষিত। স্বল্প আয় দিয়ে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই তাদের পক্ষে দুঃসাধ্য। শিক্ষকতায় মনোযোগ দেবেন কী করে। সরকারি সাহায্যের স্কুলগুলোর বাইরেও অনেক অসংখ্য শিক্ষক আছেন, যারা বলতে গেলে বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষায় ব্যয় বাড়ানো নিয়ে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের বড় সমস্যা সরকারের রাজস্ব আয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিম্নতম পর্যায়ে। যে কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ও অতি কম। তারপরও আমি মনে করি অপচয় এবং দুর্নীতি কমানো গেলে এসব খাতের ব্যয় বাড়ানো সম্ভব। সেই চেষ্টা এক দিনে হবে না। কিন্তু আমরা করেছি।

উপদেষ্টা বলেন, আমাদের শিক্ষার অনেক প্রসার হয়েছে। কিন্তু অনেকটাই অপরিকল্পিত। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো তৈরি করেছি আমরা, সেই ৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয় এতদিন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল। আমি তার মধ্যে ৪৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক কষ্টে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রত্যেকটি সিভি দেখে দেখে পদায়ণ করছি। এটা যে কত কঠিন কাজ সেটা বোঝা কঠিন। এজন্য আরও ১০-১২টা বিশ্ববিদ্যালয় বাকি রয়ে গেছে। আমরা যে এত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করছি, গ্রাজেুয়েট তৈরি করছি তার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র তৈরি করতে পারিনি। একারণে শিক্ষিত বেকারের সমস্যা এখন চরম আকার ধারণ করেছে।

শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আমাদের একটা জাতীয় শিক্ষানীতি থাকা দরকার। কিন্তু পরিকল্পিত, আধুনিক এবং দেশের উপযোগী জাতীয় শিক্ষানীতি তো দূরের কথা আমরা অন্তর্র্বতী সরকারে এসে স্কুলের শিক্ষাক্রম নিয়ে একটা বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে পড়েছি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে স্কুলের পাঠ্যবইগুলোতে নতুন দেশ গড়ার একটা প্রত্যয় প্রতিফলিত হওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু আগামীর শিক্ষাবর্ষের স্কুলের ছেলেমেয়েদের কাঁধে নতুন বই তুলে দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে মাত্র দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে পাঠ্যপুস্তকের পরিমার্জন করতে হয়েছে। তাতে হয়তো কিছু ভুল-ভ্রান্তি থেকে যাবে।

তিনি বলেন, আশা করি সকল মহলে এবং শিক্ষাবিদদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পরবর্তীতে আরও সংষ্কার সম্ভব হবে। সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত ও যুগোপযোগী করার জন্য স্বল্প মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি কী কী সংষ্কার করা যায় সেজন্য সকল বিশেষজ্ঞ এবং সকল মতামত, সকল আদর্শিক চিন্তাবিদদের আহ্বান করছি। প্রয়োজনে আমরা আমরা একটি সংস্কার কমিশনের চেষ্টা করবো।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

তরুণ প্রজন্ম ছাত্র রাজনীতির নামে অপরাজনীতির সঙ্গে পরিচিত : শিক্ষা উপদেষ্টা

প্রকাশের সময় : ০৫:১০:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৪

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

এখনকার তরুণ প্রজন্ম ছাত্র রাজনীতির নামে চরম অপরাজনীতির সঙ্গে পরিচিত বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

শনিবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবেস রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায়, বিশ্বিবদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ এবং ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের প্রধান।

তিনি বলেন, ‘ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। সমস্যা হলো এখনকার তরুণ প্রজন্ম ছাত্র রাজনীতির নামে চরম অপরাজনীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং দখলদারির রাজনীতির সাথেই শুধু পরিচিত। ছাত্রজীবনে আমিও রাজনীতি করেছি, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে ষাটের দশকের শেষের দিকে বিশ্বব্যাপী তরুণ সমাজের একটি নবজাগরণ হয়েছিল। অর্থনৈতিক, রাজেনৈতিক যত অব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র আন্দোলনের মুখেই অন্যায্য ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করতে আমেরিকা বাধ্য হয়। আমরাও ঢাকা বসে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ হোক সে দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম।’

শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের বায়ান্ন, উনসত্তর, নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের গৌরবময় ঐতিহ্য আছে। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের বড় অংশগ্রহণ ছিল। সর্বশেষ আমরা এখন ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান দেখলাম। ফলে অন্তর্বতী সরকার গঠিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা এবং সেই সাথে মুক্ত চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার স্বাধীনতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় শিক্ষার্থীরা ভোটার হিসেবে অবশ্যই রাজনীতির অংশ কিন্তু যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি আচরণবিধি নির্ধারিত থাকে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আমি আশা করবো নিজেদের প্রজ্ঞা দিয়ে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের নিজস্ব আচরণবিধি তৈরি করতে পারবে।’

অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অনেক নিচের দিকে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা শিক্ষকদের দাবি পূরণের চেষ্টা করবো। কিন্তু তাদের দায়িত্বের জায়গা থেকেও জবাবদিহিতা এবং নজরদারি থাকতে হবে।

শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, প্রতিদিন অতন্ত চার-পাঁচটা বড় বড় দাবি আমার কাছে আসে। কিন্তু তারপরও আমি বিরক্ত হই না। আমি নিজেকে অপরাধী মনে করি তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারি না বলে, নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাই। এদেশের পুরো শিক্ষকতা পেশা, বিশেষভাবে উল্লেখ করবো বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকরা অন্য সমতুল্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং উপেক্ষিত। স্বল্প আয় দিয়ে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই তাদের পক্ষে দুঃসাধ্য। শিক্ষকতায় মনোযোগ দেবেন কী করে। সরকারি সাহায্যের স্কুলগুলোর বাইরেও অনেক অসংখ্য শিক্ষক আছেন, যারা বলতে গেলে বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষায় ব্যয় বাড়ানো নিয়ে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের বড় সমস্যা সরকারের রাজস্ব আয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিম্নতম পর্যায়ে। যে কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ও অতি কম। তারপরও আমি মনে করি অপচয় এবং দুর্নীতি কমানো গেলে এসব খাতের ব্যয় বাড়ানো সম্ভব। সেই চেষ্টা এক দিনে হবে না। কিন্তু আমরা করেছি।

উপদেষ্টা বলেন, আমাদের শিক্ষার অনেক প্রসার হয়েছে। কিন্তু অনেকটাই অপরিকল্পিত। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো তৈরি করেছি আমরা, সেই ৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয় এতদিন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল। আমি তার মধ্যে ৪৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক কষ্টে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রত্যেকটি সিভি দেখে দেখে পদায়ণ করছি। এটা যে কত কঠিন কাজ সেটা বোঝা কঠিন। এজন্য আরও ১০-১২টা বিশ্ববিদ্যালয় বাকি রয়ে গেছে। আমরা যে এত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করছি, গ্রাজেুয়েট তৈরি করছি তার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র তৈরি করতে পারিনি। একারণে শিক্ষিত বেকারের সমস্যা এখন চরম আকার ধারণ করেছে।

শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আমাদের একটা জাতীয় শিক্ষানীতি থাকা দরকার। কিন্তু পরিকল্পিত, আধুনিক এবং দেশের উপযোগী জাতীয় শিক্ষানীতি তো দূরের কথা আমরা অন্তর্র্বতী সরকারে এসে স্কুলের শিক্ষাক্রম নিয়ে একটা বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে পড়েছি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে স্কুলের পাঠ্যবইগুলোতে নতুন দেশ গড়ার একটা প্রত্যয় প্রতিফলিত হওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু আগামীর শিক্ষাবর্ষের স্কুলের ছেলেমেয়েদের কাঁধে নতুন বই তুলে দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে মাত্র দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে পাঠ্যপুস্তকের পরিমার্জন করতে হয়েছে। তাতে হয়তো কিছু ভুল-ভ্রান্তি থেকে যাবে।

তিনি বলেন, আশা করি সকল মহলে এবং শিক্ষাবিদদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পরবর্তীতে আরও সংষ্কার সম্ভব হবে। সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত ও যুগোপযোগী করার জন্য স্বল্প মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি কী কী সংষ্কার করা যায় সেজন্য সকল বিশেষজ্ঞ এবং সকল মতামত, সকল আদর্শিক চিন্তাবিদদের আহ্বান করছি। প্রয়োজনে আমরা আমরা একটি সংস্কার কমিশনের চেষ্টা করবো।