Dhaka রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জেল কর্তৃপক্ষের মানবিকতায় ৩০ বছর পর কারামুক্ত হলেন বৃদ্ধা

নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি : 

মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রায় তিন দশক কারাভোগের পর এক বৃদ্ধাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। ১৯৯৮ সালের একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত রাহেলা বেগম ৩০ বছর পর কারামুক্ত হয়েছেন নওগাঁ জেলা কারাগার থেকে।

রাহেলা বেগমের বিরুদ্ধে ১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলা করা হয়। ওই মামলায় তৎকালীন আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

গ্রেপ্তারের পর শুরু হয় তার দীর্ঘ কারাজীবন। স্বামী, সন্তান কিংবা নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি না থাকায় কারাগারের চার দেয়ালই হয়ে ওঠে তার জীবন। মাঝেমধ্যে বড় বোন সায়েলা জেলগেটে গিয়ে তার খোঁজ নিলেও অধিকাংশ সময় একাই কাটাতে হয়েছে তাকে।
গত ১২ জানুয়ারি রাহেলা বেগমের যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ শেষ হয়।

তবে মামলায় ধার্য জরিমানার সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা অনাদায়ী থাকায় তাকে আরও প্রায় দুই বছর কারাভোগ করতে হতো। বিষয়টি জানালে অসহায় রাহেলার পক্ষে জরিমানার টাকা পরিশোধ করা যে অসম্ভব, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ অবস্থায় মানবিক বিবেচনায় এগিয়ে আসে কারা কর্তৃপক্ষ। নওগাঁ জেলা কারাগারের তৎকালীন জেল সুপার নিজ উদ্যোগে জেল তহবিল থেকে জরিমানার সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। পরে রাহেলাকে তার বোনজামাইয়ের মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রাহেলা বেগমের বাড়ি নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামে। বর্তমানে তিনি তার ৭০ ঊর্ধ্ব বড় বোন সায়েলার বাড়িতে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ কারাভোগের কারণে তার স্মৃতিশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বয়স এখন প্রায় ৬৪ বছর। আপন বোন ছাড়া চারপাশের মানুষ তার কাছে অনেকটাই অপরিচিত।

কারাজীবনের কথা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহেলা। ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেন, কারাগারের ভেতরে বসে প্রতিটি মুহূর্ত মুক্তির অপেক্ষায় কাটিয়েছেন। এর বেশি কিছু বলার শক্তি পাননি তিনি।

রাহেলার বড় বোন সায়েলা বলেন, বোনের জন্য আল্লাহর কাছে অনেক কেঁদেছি। শুধু চাইতাম, অন্তত জীবিত ফিরে আসুক। অনেক সময় সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন বোনকে কাছে পেয়ে খুব ভালো লাগছে। মামলার বিষয়ে ক্ষোভ থাকলেও এখন আর সেসব মনে করতে চান না বলেও জানান তিনি।

রাহেলার মুক্তির খবরে তাকে দেখতে আসছেন এলাকার অনেক মানুষ। তারা জানান, ছোটবেলায় মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন রাহেলা। চলাফেরায় বেশ স্বাভাবিক ছিলেন। তবে প্রায় ৩০ বছর আগের রাহেলার সঙ্গে বর্তমান রাহেলার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।

নওগাঁ জেলা কারাগারের সুপারের দায়িত্বে থাকা রত্না রায় বলেন, রাহেলা ছিলেন কারাগারের সবচেয়ে প্রবীণ নারী কয়েদি। বিভিন্ন সময় তার খোঁজখবর নেওয়া হতো। যেহেতু তার যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছিল, তাই মানবিক বিবেচনায় দ্রুত তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যেই জেল তহবিল থেকে তার জরিমানার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

 

 

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

নানক-তাপসসহ পলাতক ২৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

জেল কর্তৃপক্ষের মানবিকতায় ৩০ বছর পর কারামুক্ত হলেন বৃদ্ধা

প্রকাশের সময় : ০১:২১:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি : 

মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রায় তিন দশক কারাভোগের পর এক বৃদ্ধাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। ১৯৯৮ সালের একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত রাহেলা বেগম ৩০ বছর পর কারামুক্ত হয়েছেন নওগাঁ জেলা কারাগার থেকে।

রাহেলা বেগমের বিরুদ্ধে ১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলা করা হয়। ওই মামলায় তৎকালীন আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

গ্রেপ্তারের পর শুরু হয় তার দীর্ঘ কারাজীবন। স্বামী, সন্তান কিংবা নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি না থাকায় কারাগারের চার দেয়ালই হয়ে ওঠে তার জীবন। মাঝেমধ্যে বড় বোন সায়েলা জেলগেটে গিয়ে তার খোঁজ নিলেও অধিকাংশ সময় একাই কাটাতে হয়েছে তাকে।
গত ১২ জানুয়ারি রাহেলা বেগমের যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ শেষ হয়।

তবে মামলায় ধার্য জরিমানার সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা অনাদায়ী থাকায় তাকে আরও প্রায় দুই বছর কারাভোগ করতে হতো। বিষয়টি জানালে অসহায় রাহেলার পক্ষে জরিমানার টাকা পরিশোধ করা যে অসম্ভব, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ অবস্থায় মানবিক বিবেচনায় এগিয়ে আসে কারা কর্তৃপক্ষ। নওগাঁ জেলা কারাগারের তৎকালীন জেল সুপার নিজ উদ্যোগে জেল তহবিল থেকে জরিমানার সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। পরে রাহেলাকে তার বোনজামাইয়ের মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রাহেলা বেগমের বাড়ি নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামে। বর্তমানে তিনি তার ৭০ ঊর্ধ্ব বড় বোন সায়েলার বাড়িতে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ কারাভোগের কারণে তার স্মৃতিশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বয়স এখন প্রায় ৬৪ বছর। আপন বোন ছাড়া চারপাশের মানুষ তার কাছে অনেকটাই অপরিচিত।

কারাজীবনের কথা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহেলা। ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেন, কারাগারের ভেতরে বসে প্রতিটি মুহূর্ত মুক্তির অপেক্ষায় কাটিয়েছেন। এর বেশি কিছু বলার শক্তি পাননি তিনি।

রাহেলার বড় বোন সায়েলা বলেন, বোনের জন্য আল্লাহর কাছে অনেক কেঁদেছি। শুধু চাইতাম, অন্তত জীবিত ফিরে আসুক। অনেক সময় সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন বোনকে কাছে পেয়ে খুব ভালো লাগছে। মামলার বিষয়ে ক্ষোভ থাকলেও এখন আর সেসব মনে করতে চান না বলেও জানান তিনি।

রাহেলার মুক্তির খবরে তাকে দেখতে আসছেন এলাকার অনেক মানুষ। তারা জানান, ছোটবেলায় মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন রাহেলা। চলাফেরায় বেশ স্বাভাবিক ছিলেন। তবে প্রায় ৩০ বছর আগের রাহেলার সঙ্গে বর্তমান রাহেলার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।

নওগাঁ জেলা কারাগারের সুপারের দায়িত্বে থাকা রত্না রায় বলেন, রাহেলা ছিলেন কারাগারের সবচেয়ে প্রবীণ নারী কয়েদি। বিভিন্ন সময় তার খোঁজখবর নেওয়া হতো। যেহেতু তার যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছিল, তাই মানবিক বিবেচনায় দ্রুত তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যেই জেল তহবিল থেকে তার জরিমানার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।