Dhaka বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জুলাই সনদে একাত্তরকে মুছে ফেলার অপপ্রচার ভিত্তিহীন : আলী রীয়াজ

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি : 

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ স্পষ্ট করেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ পাস হলে সংবিধান থেকে ১৯৭১ সালের ইতিহাস মুছে ফেলা হবে কিংবা ‘বিসমিল্লাহ’ বাদ দেওয়া হবে বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের জিমনেসিয়াম সংলগ্ন মাঠে আয়োজিত বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি যে গণভোট হবে, সেটি ‘হ্যাঁ–না ভোট’। এখানে কোনো ব্যক্তি বা সরকারকে নয়, বরং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অনুমোদন দেয়ার প্রশ্ন রাখা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ মানে—রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে সম্মতি।

আলী রীয়াজ বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি; অনেকেই হয়তো কোনো দিনই ফিরতে পারবেন না। গুম, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলো আমাদের ওপর একটি বড় দায়িত্ব অর্পণ করেছেন—যেন ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

তিনি বলেন, শুধু জুলাই-আগস্ট নয়, গত ১৬ বছরে অসংখ্য মা সন্তান হারিয়েছেন, স্ত্রী অপেক্ষা করেছেন স্বামীর ফেরার আশায়। অনেক সন্তান কখনো বাবাকে দেখার সুযোগ পায়নি। এই আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, তা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে।

আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে নির্বাচন হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, প্রাণ দেয়া হয়েছে; কিন্তু যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্রটি গড়ে তোলা হয়েছিল, সেখানে বারবার ব্যর্থতা এসেছে। এক কদম এগোলে দুই কদম পেছাতে হয়েছে। অথচ দেশের এক–তৃতীয়াংশ মানুষ ৩৭ বছরের নিচে—এই তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব।

‘জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে। ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দল নয় মাসের বেশি সময় আলোচনার মাধ্যমে এই দলিল তৈরি করেছে। জনগণ অনুমোদন দিলে ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের এই সনদ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকতে হবে।’ উল্লেখ করেন তিনি।

আলী রীয়াজ বলেন, গত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। সংবিধান প্রয়োজনে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের মতামত নেওয়া হয়নি। নতুন ব্যবস্থায় এসব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন, মেধাভিত্তিক চাকরি ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র সম্ভব নয়।

বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, বিচার পেতে মানুষ যেন রাজধানীমুখী হতে বাধ্য না হয়। উপজেলা পর্যায়ে আদালত ও বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।

সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি জীবনে ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত। একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধন কঠিন করতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে একক সিদ্ধান্তে সংবিধান পরিবর্তন করা না যায়।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ইমাম ও খতিবদের মত প্রকাশে কোনো আইনগত বাধা নেই জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘যুক্তিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়েই মতভেদ নিরসন করতে হবে—এটাই গণতন্ত্রের শিক্ষা।’

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

‘ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যা’: জয়-পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ ২১ জানুয়ারি

জুলাই সনদে একাত্তরকে মুছে ফেলার অপপ্রচার ভিত্তিহীন : আলী রীয়াজ

প্রকাশের সময় : ০৩:৫৪:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি : 

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ স্পষ্ট করেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ পাস হলে সংবিধান থেকে ১৯৭১ সালের ইতিহাস মুছে ফেলা হবে কিংবা ‘বিসমিল্লাহ’ বাদ দেওয়া হবে বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের জিমনেসিয়াম সংলগ্ন মাঠে আয়োজিত বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি যে গণভোট হবে, সেটি ‘হ্যাঁ–না ভোট’। এখানে কোনো ব্যক্তি বা সরকারকে নয়, বরং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অনুমোদন দেয়ার প্রশ্ন রাখা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ মানে—রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে সম্মতি।

আলী রীয়াজ বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি; অনেকেই হয়তো কোনো দিনই ফিরতে পারবেন না। গুম, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলো আমাদের ওপর একটি বড় দায়িত্ব অর্পণ করেছেন—যেন ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

তিনি বলেন, শুধু জুলাই-আগস্ট নয়, গত ১৬ বছরে অসংখ্য মা সন্তান হারিয়েছেন, স্ত্রী অপেক্ষা করেছেন স্বামীর ফেরার আশায়। অনেক সন্তান কখনো বাবাকে দেখার সুযোগ পায়নি। এই আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, তা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে।

আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে নির্বাচন হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, প্রাণ দেয়া হয়েছে; কিন্তু যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্রটি গড়ে তোলা হয়েছিল, সেখানে বারবার ব্যর্থতা এসেছে। এক কদম এগোলে দুই কদম পেছাতে হয়েছে। অথচ দেশের এক–তৃতীয়াংশ মানুষ ৩৭ বছরের নিচে—এই তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব।

‘জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে। ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দল নয় মাসের বেশি সময় আলোচনার মাধ্যমে এই দলিল তৈরি করেছে। জনগণ অনুমোদন দিলে ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের এই সনদ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকতে হবে।’ উল্লেখ করেন তিনি।

আলী রীয়াজ বলেন, গত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। সংবিধান প্রয়োজনে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের মতামত নেওয়া হয়নি। নতুন ব্যবস্থায় এসব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন, মেধাভিত্তিক চাকরি ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র সম্ভব নয়।

বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, বিচার পেতে মানুষ যেন রাজধানীমুখী হতে বাধ্য না হয়। উপজেলা পর্যায়ে আদালত ও বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।

সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি জীবনে ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত। একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধন কঠিন করতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে একক সিদ্ধান্তে সংবিধান পরিবর্তন করা না যায়।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ইমাম ও খতিবদের মত প্রকাশে কোনো আইনগত বাধা নেই জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘যুক্তিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়েই মতভেদ নিরসন করতে হবে—এটাই গণতন্ত্রের শিক্ষা।’