চীনা ঋণে বাস্তবায়ন হবে আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ রেললাইন

সিলেট জেলা প্রতিনিধি : 

দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে অর্থায়ন সংকট ও নানা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকা আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্প অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোতে শুরু করেছে। প্রকল্পটির জন্য চীনের সরকারি ঋণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই রেল প্রকল্প নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ১১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত মোট ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে উন্নীত হবে। এর মধ্যে ১৭৬ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মূল লাইন এবং ৬২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হবে। নতুন এই অবকাঠামোয় ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার গতিতে চলাচলের সুযোগ পাবে। ফলে ব্রডগেজ ট্রেনও এই পথে চলতে পারবে এবং সিলেটের সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে প্রকল্পটির পরিকল্পনা গৃহীত হলেও অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, চীন ও ভারতের সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়নের বাইরে থেকে যায়। অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপি থেকেও প্রকল্পটি বাদ পড়েছিল। তবে সম্প্রতি চীন পুনরায় সরকারি ঋণ দিতে সম্মত হওয়ায় প্রকল্পটি নতুন গতি পেয়েছে।

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীনের সরকারি ঋণ হিসেবে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এর নির্মাণ দায়িত্ব পেতে পারে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিআরসিসি)।

শুধু ডুয়েলগেজ নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে একই সঙ্গে ডাবল লাইন নির্মাণের দাবিও জোরালো হচ্ছে। রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, ডাবল লাইন হলে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলাচল, ক্রসিংজনিত বিলম্ব কমানো এবং ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, ডুয়েলগেজ নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে একই সঙ্গে ডাবল লাইন করা গেলে এই রুটের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। বর্তমানে এক লাইনের কারণে ট্রেন ক্রসিংয়ে সময় নষ্ট হয়। ডাবল লাইন হলে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন উভয়ের চলাচল আরও সহজ হবে।

বর্তমানে আখাউড়া-সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয় জোড়া আন্তনগর ট্রেন—পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনি এক্সপ্রেস—চলাচল করে, যাতে প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। তবে পুরনো রেললাইন, মেয়াদোত্তীর্ণ অবকাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে এই রুটের অনেক স্থানে ট্রেনকে ধীরগতিতে চলতে হয়। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে অন্তত ১৩টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একসময় যেখানে ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করত, বর্তমানে অনেক অংশে সেই গতি নেমে এসেছে প্রায় ৪০ কিলোমিটারে, যার ফলে যাত্রার সময় বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

এই রুটের নিয়মিত যাত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমানে ঢাকা-সিলেট যেতে অনেক সময় লাগে। মাঝেমধ্যে ট্রেন দীর্ঘক্ষণ বিভিন্ন স্টেশনে অপেক্ষা করে। ডাবল লাইন হলে যদি যাত্রার সময় কমে, তাহলে সাধারণ যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।

তবে প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, একই ধরনের অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় এখানে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া ঠিকাদার নির্বাচন, ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

তবে সরকারের অবস্থান হলো, দেশের রেল যোগাযোগ আধুনিকায়ন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে জাতীয় যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি সিলেট সফরে এসে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ সেবাটুকু নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

প্রবাসফেরত অসুস্থ জামালকে রাস্তার পাশে ফেলে গেল স্ত্রী-সন্তান

চীনা ঋণে বাস্তবায়ন হবে আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ রেললাইন

প্রকাশের সময় : ০৬:১২:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

সিলেট জেলা প্রতিনিধি : 

দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে অর্থায়ন সংকট ও নানা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকা আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্প অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোতে শুরু করেছে। প্রকল্পটির জন্য চীনের সরকারি ঋণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই রেল প্রকল্প নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ১১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত মোট ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে উন্নীত হবে। এর মধ্যে ১৭৬ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মূল লাইন এবং ৬২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হবে। নতুন এই অবকাঠামোয় ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার গতিতে চলাচলের সুযোগ পাবে। ফলে ব্রডগেজ ট্রেনও এই পথে চলতে পারবে এবং সিলেটের সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে প্রকল্পটির পরিকল্পনা গৃহীত হলেও অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, চীন ও ভারতের সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়নের বাইরে থেকে যায়। অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপি থেকেও প্রকল্পটি বাদ পড়েছিল। তবে সম্প্রতি চীন পুনরায় সরকারি ঋণ দিতে সম্মত হওয়ায় প্রকল্পটি নতুন গতি পেয়েছে।

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীনের সরকারি ঋণ হিসেবে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এর নির্মাণ দায়িত্ব পেতে পারে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিআরসিসি)।

শুধু ডুয়েলগেজ নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে একই সঙ্গে ডাবল লাইন নির্মাণের দাবিও জোরালো হচ্ছে। রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, ডাবল লাইন হলে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলাচল, ক্রসিংজনিত বিলম্ব কমানো এবং ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, ডুয়েলগেজ নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে একই সঙ্গে ডাবল লাইন করা গেলে এই রুটের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। বর্তমানে এক লাইনের কারণে ট্রেন ক্রসিংয়ে সময় নষ্ট হয়। ডাবল লাইন হলে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন উভয়ের চলাচল আরও সহজ হবে।

বর্তমানে আখাউড়া-সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয় জোড়া আন্তনগর ট্রেন—পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনি এক্সপ্রেস—চলাচল করে, যাতে প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। তবে পুরনো রেললাইন, মেয়াদোত্তীর্ণ অবকাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে এই রুটের অনেক স্থানে ট্রেনকে ধীরগতিতে চলতে হয়। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে অন্তত ১৩টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একসময় যেখানে ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করত, বর্তমানে অনেক অংশে সেই গতি নেমে এসেছে প্রায় ৪০ কিলোমিটারে, যার ফলে যাত্রার সময় বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

এই রুটের নিয়মিত যাত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমানে ঢাকা-সিলেট যেতে অনেক সময় লাগে। মাঝেমধ্যে ট্রেন দীর্ঘক্ষণ বিভিন্ন স্টেশনে অপেক্ষা করে। ডাবল লাইন হলে যদি যাত্রার সময় কমে, তাহলে সাধারণ যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।

তবে প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, একই ধরনের অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় এখানে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া ঠিকাদার নির্বাচন, ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

তবে সরকারের অবস্থান হলো, দেশের রেল যোগাযোগ আধুনিকায়ন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে জাতীয় যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি সিলেট সফরে এসে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ সেবাটুকু নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।