নিজস্ব প্রতিবেদক :
গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকারের স্বার্থে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে বলে দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কূটনৈতিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে আয়োজিত পলিসি সামিট-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে ফ্যাসিবাদ কায়েম করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে যারা অবস্থান নেবে, তেমন যে কোনো রাজনৈতিক দলকে আগামীর অগ্রযাত্রায় সঙ্গী করতে প্রস্তুত জামায়াত।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও অসমাপ্ত সংগ্রামের ইতিহাস—রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও মানবিক মর্যাদার সংগ্রাম। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তি। তবে পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও সেই প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চার কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, জবাবদিহি কমেছে এবং নাগরিকদের কণ্ঠস্বর সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আবারও জনগণ—বিশেষ করে তরুণরা নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের দাবিতে দাঁড়িয়ে গেছে।
জামায়াত আমির বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি অন্ধকার অধ্যায় পার করে আমরা এখন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এই পথে এখনো বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থানের মান কমে গেছে। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ ও স্বল্প আয়ের কাজে নিয়োজিত। তরুণ শিক্ষিতরা শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে রূপান্তর ঘটাতে পারছে না, আর নারীরা সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পরিকল্পনার সক্ষমতা তৈরি করাই হওয়া উচিত অর্থনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি।
তিনি বলেন, বিপুল সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণ। দেশের ভেতরে শ্রমজীবী মানুষ এবং দেশের বাইরে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকরা অর্থনীতি সচল রাখছেন। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু অর্থনৈতিক অবদান নয়, বরং দক্ষতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার একটি বড় উৎস।
সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। অতীতে জামায়াতের নেতৃত্বে পরিচালিত মন্ত্রণালয়গুলোতে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ প্রশাসনের নজির রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।
নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণের হারের দিক থেকে জামায়াতে ইসলামী শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে দলের মোট সদস্যের প্রায় ৪৩ শতাংশই নারী—যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে নারীরা যেন সমান নাগরিক হিসেবে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে, সেজন্য প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষায় সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে। নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কোনো ধরনের বৈষম্য বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা সমান সুযোগ, ন্যায় ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাস করে, জামায়াতে ইসলামী তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।
তরুণদের দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, নতুন বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় যুব কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানহীন তরুণ সমাজ কোনো দেশের জন্য বড় ঝুঁকি—আর কর্মক্ষম তরুণ সমাজই পারে একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে।
তিনি একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন, যেখানে স্বচ্ছ বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে একটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে, যাতে বিনিয়োগে আস্থা তৈরি হয়।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে—সে বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী আপসহীন থাকবে। দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতা বজায় না থাকলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে তিনি কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তার মতে, কৃষিকে উপেক্ষা করে কোনো দেশ টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষাকে জামায়াত আমির কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ‘পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর দলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী প্রায় পাঁচ লাখ সদস্য রয়েছেন, যারা দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় তার দল অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে এবং এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সামিটে উপস্থিত বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ ও রিসোর্স পারসনদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সময় বিভাজনের নয়—বরং সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়।
স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ঐক্যের মধ্য দিয়েই একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
শেষে তিনি বলেন, ইনসাফ, মর্যাদা ও সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়াই আমাদের লক্ষ্য। জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















