Dhaka শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

খালেদা জিয়ার মানসিকতা ধারণ করার আহ্বান বিশিষ্টজনদের

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

প্রয়াত হওয়ার এক মাস পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এতে অংশ নিয়ে খালেদা জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। তাঁর কর্মময় জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন বক্তারা। আগামী দিনে বিএনপিকে খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া আদর্শ ধারণ করে চলার পরামর্শও দেন তাঁরা।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘অপরাজেয় বেগম খালেদা জিয়া’ শীর্ষক এই সভায় বক্তারা এই মন্তব্য করেন। এসময় সকল রাজনীতিবিদদের বেগম জিয়ার মানসিকতা ধারণ করার আহ্বানও জানান।

বক্তারা মরহুম নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও চারিত্রিক দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা বলেন, দীর্ঘ সময় কারাবাস ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সহ্য করেও তিনি কখনো প্রতিহিংসার পথ বেছে নেননি বরং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তার শেষ ভাষণে তিনি উদারতা ও জাতীয় ঐক্যের যে ডাক দিয়েছিলেন তা আগামীর বাংলাদেশ গড়ার মূল পাথেয় হয়ে থাকবে।

ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র সবকিছুই আমাদের জন্য মূল্যবান। কিন্তু ভবিষ্যৎ হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, আগামী নেতৃত্বকে বলব যে খালেদা জিয়ার শেষ বাণী হলো জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। আমরা যেন এটা সবার অন্তরের ভেতরে উপলব্ধি করি।

খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থেই দেশনেত্রী হয়ে উঠেছিলেন: শোকসভায় বক্তারা

বাংলাদেশকে আমরা ভালোবাসি, বাংলাদেশকে আমরা অন্তর থেকে ভালোবাসি মন্তব্য করে মাহফুজ আনাম বলেন, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির এক সভায় ভাষণ দিলেন এবং সেখানে উনি যে মূল বাণীটা আমাদেরকে দিলেন– ধ্বংস নয়, প্রতিরোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, প্রতিশোধ নয়।

‘উনি কিন্তু ইজিলি বলতে পারতেন যে আমি প্রতিশোধ চাই না কিন্তু আমি ন্যায়বিচার চাই, আমার বিরুদ্ধে যা করা হয়েছে। এটা উনি বললেন না। এই যে উদারতা তিনি সেদিন দেখিয়েছেন এটা অসাধারণ গুণ।’

তিনি বলেন, আমি মনে করি বেগম জিয়ার এই উদারতা যদি আমাদের রাজনীতিতে আমরা এখন অন্তঃস্থ করতে পারি, যদি আমরা নিজের মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের একটা বিরাট অবদান থাকবে।

যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, যে করেই হোক ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস সবাইকে আশ্বাস দিচ্ছেন এবং বারবার বলছেন যে ওই নির্বাচন হবে একটি আনন্দমুখর, উৎসবের দিন। তিনি নিজেও তা প্রত্যাশা করেন। তবে এর জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

2

শফিক রেহমান বলেন, তিনি আশা করেন ভোটের দিন পুলিশ বাহিনী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ভোটকেন্দ্র যেন সত্যিকার অর্থে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এবং সবাই সপরিবারে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন। তিনি বলেন, আজকের এই শোকসভাকে অর্থবহ করতে হলে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সহিংসতার মাধ্যমে যেন গোটা জাতির নির্বাচনী আশা নষ্ট না হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, খালেদা জিয়া কেবল একটি জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। যা দলমত নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের তার জানাজায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, মানুষ ও রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার যে গুণটি আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে, তা হলো তার রুচিশীলতা ও পরিমিতিবোধ। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা ও সংযমের ঘাটতি প্রকট। তখন আমি লক্ষ্য করেছি- তিনি নিরন্তর ও বিনা ব্যতিক্রমে একজন রাজনীতিক হিসেবে, নিজের ওপর ও তার পরিবারের ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে যে আঘাত ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে, সেসবের প্রতিক্রিয়ায় কখনোই প্রকাশ্যে নিজের বেদনা, ক্ষোভ কিংবা নিন্দাসূচক কোনো বক্তব্য উচ্চারণ করেননি।’

6

‘আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব সহজ কথা হতে পারে। কিন্তু এই যে সংযম, পরিমিতিবোধ ও আত্মমর্যাদা- রাজনীতিতে অনেক অনুসারী থাকতে পারে, অনেক মত ও পথদর্শন থাকতে পারে, কিন্তু যিনি যেই রাজনীতির, যেই সংস্কৃতিরই অনুসারী হন না কেন, এই বিষয়টি আজকের বাংলাদেশের অসহিষ্ণুতার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি,’ যোগ করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার জানাজা প্রসঙ্গে নূরুল কবীর জানান, সেদিন বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বিএনপির এক নেতা লাখ লাখ মানুষকে কথা দিয়েছিলেন যে তাদের রাজনীতি খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত হবে। এই কথাটি রাখতে বিএনপিকে অনুরোধ করেন তিনি।

আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সংগ্রামের পতাকা আজ তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। এটি যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি এক গভীর দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জেরও বিষয়।’

বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের সন্তান হওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ভয় ও শঙ্কার বিষয়ও। কারণ বাংলাদেশের মানুষ সবসময় তারেক রহমানকে তার বাবা ও মায়ের সঙ্গে তুলনা করবে। এই তুলনা অত্যন্ত কঠিন- যে কোনো মানুষের জন্যই।

আমার দেশ সম্পাদক বলেন, বাংলাদেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে মাত্র দুজন নেতা-নেত্রী জন্মেছেন, যাদের সমতুল্য হওয়া কঠিন। আর তারা যদি বাবা-মা হন, তাহলে সেই সন্তানদের জন্য দায়িত্ব আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’ আজ শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার সেই অবিস্মরণীয় পতাকা, সেই শক্তি ও স্বাধীনতার পতাকা তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে।

তিনি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেন, আল্লাহ যেন তারেক রহমানকে এই ঐতিহাসিক পতাকা বহন করার শক্তি ও সামর্থ্য দান করেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের শত বছরের ইতিহাসে একমাত্র স্বামী-স্ত্রী, যারা সারাজীবন জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন। তারা যে জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন, সেই একই জনপ্রিয়তা নিয়েই আল্লাহর কাছে ফিরে গেছেন।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে একই পরিবার থেকে স্বামী ও স্ত্রী- দুজনই পুরো জাতির সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছেন, এরকম উদাহরণ পৃথিবীতে নেই। এটি একটি সম্পূর্ণ ইউনিক ঘটনা, যা আমাদের মনে রাখা দরকার।’

লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ বলেন, এই জনপদের মানুষ তাকে মনে রাখবে তার ত্যাগ, সততা, অত্যাচার সহ্য করার অপরিসীম ক্ষমতাসহ নানা গুণের কারণে। তার দেওয়া মন্ত্রগুলো ধারণ করলে তার দল এবং দেশ রক্ষা পাবে, অন্যথায় পাবে না। তার মৃত্যুতে সময় এবং আগামীর মৃত্যু হয়নি, বরং খালেদা জিয়া এবং তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় চরম অবহেলা ও ইচ্ছাকৃত গাফিলতির অভিযোগ করে তার চিকিৎসা দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি ওষুধ তার লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জনের’ মতো কাজ করেছে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, অনেকেই প্রশ্ন করেন, ম্যাডামকে কি স্লো পয়জন করা হয়েছে? আমার উত্তর হচ্ছে, ‘মেথোট্রেক্সেট’ ছিল সেই ওষুধ, যা তার ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে দ্রুত লিভার সিরোসিসে রূপান্তরিত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে এটি তার লিভারের জন্য ধীরে ধীরে বিষের মতো কাজ করেছে।

তিনি বলেন, আজ দেশের লক্ষ-কোটি মানুষের বুকের ভেতরে গভীর এক আফসোস কাজ করছে। সারাজীবন গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকার করা মানুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন! যদি দেখতে পেতেন মানুষ নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে!

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. সিদ্দ্কিী বলেন, ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আমরা, বর্তমান মেডিকেল বোর্ড, তার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করি। ভর্তি হওয়ার পরপরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা বিস্ময় ও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখতে পাই যে ম্যাডাম লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত।

তিনি বলেন, এর আগের চিকিৎসা ছাড়পত্র অনুযায়ী রিউমাটয়েড আর্থাইটিসের জন্য তাকে নিয়মিত ‘মেথোট্রেক্সেট’ নামের ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছিল, যা হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেও চালু রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে এই ওষুধ বন্ধ করে দিই।

ডা. সিদ্দিকী বলেন, বেগম খালেদা জিয়া একই সঙ্গে ফ্যাটি লিভার ডিজিজেও আক্রান্ত ছিলেন। এমন অবস্থায় নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট করা এবং প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা ছিল অত্যাবশ্যক।

তিনি বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ আসার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি, এমনকি মেথোট্রেক্সেটও বন্ধ করেনি।

খালেদা জিয়াকে স্লো পয়জন দেওয়া হয়েছে: ডা. সিদ্দিকী

তিনি বলেন, তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে বেগম খালেদা জিয়া সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে রাজি হননি। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তার আস্থাভাজন চিকিৎসক দিয়ে বেডসাইডে ‘পয়েন্ট অব কেয়ার আল্ট্রাসাউন্ড’ করা যেত, অথবা অন্তত মেথোট্রেক্সেট বন্ধ করা ছিল ন্যূনতম দায়িত্ব।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দ্কিী অভিযোগ করে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় এ ধরনের অবহেলা, লিভার ফাংশনের দ্রুত অবনতি তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটি ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা। এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এটি তাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ডায়াবেটিস ও আর্থাইটিসের চিকিৎসায়ও অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের কাছে রয়েছে।

এ ঘটনায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে আইনগত তদন্তের দাবি জানিয়ে অধ্যাপক ডা. সিদ্দিকী তিনটি বিষয় উল্লেখ করেন– সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা কারা ছিলেন এবং কী যোগ্যতায় তারা চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন; চিকিৎসাকালে কোন কোন চিকিৎসক সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং সেখানে অবহেলার প্রমাণ আছে কিনা; এবং বেগম খালেদা জিয়া কেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের চিকিৎসা দলে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি বা কারা এতে বাধা দিয়েছিল।

সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নথি আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ডা. সিদ্দিকী বলেন, আমরা আশা করি, সরকার ম্যাডামের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেবে। আমরা জানি, ন্যায়বিচারে বিলম্ব মানেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া।

লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আব্দুস সালাম বলেন, “বিএনপি বিশ বছর অত্যাচারের পরও জনগণের ভালোবাসায় টিকে রয়েছে। এর মূল কারণ বেগম জিয়ার দৃঢ়চেতা রাজনীতি।”

ব্যবসায়ী সিমিন রহমান বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া মানুষ হিসেবে আপসহীন ছিলেন। দেশের অর্থনীতিতে তার অবদান ছিল। তিনি বলতেন, ব্যবসা করতে হবে নৈতিকতার সঙ্গে। আমার বাবা লতিফুর রহমানের কাছ থেকে শুনেছি, বেগম খালেদা জিয়া সঠিকভাবে ব্যবসা করতে বলেছেন। তার জান্নাত কামনা করছি।”

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে। শিল্পায়ন হয়েছে।”

সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির বলেন, “বাংলাদেশ রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম খালেদা জিয়া। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা। কঠিন সময়েও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ধ্বংস নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমার বিবেচনায় তিনি বিচক্ষণ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার দাবি জানাই।”

8

বেগম খালেদা জিয়া স্মরণে নাগরিক শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন। উপস্থাপনায় ছিলেন আশরাফ কায়সার এবং কাজী জেসিন। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক শোকসভায় সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা।

দলের সাবেক চেয়ারপারসনের শোকসভায় যোগ দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা।

কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শোকসভা শুরু হয়। এরপর খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকবার্তা পাঠ করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন। এরপর সভায় একে একে বক্তব্য দেন লেখক ফাহাম আব্দুস সালাম, পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, খালেদা জিয়ার চিকিৎসক এফ এম সিদ্দিকী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী দেবাশীষ রায়, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, জ্যেষ্ঠ সম্পাদক শফিক রেহমান, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ডিপিআইয়ের সভাপতি আব্দুস সাত্তার দুলাল, সাবেক কূটনীতিক আনোয়ার হাশিম, আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ, লেখক ও গবেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন। এরপর খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে স্মরণসভা শেষ হয়।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

সরকারের কাজ জনগণকে ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করা : আমীর খসরু

খালেদা জিয়ার মানসিকতা ধারণ করার আহ্বান বিশিষ্টজনদের

প্রকাশের সময় : ০৮:২০:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

প্রয়াত হওয়ার এক মাস পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এতে অংশ নিয়ে খালেদা জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। তাঁর কর্মময় জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন বক্তারা। আগামী দিনে বিএনপিকে খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া আদর্শ ধারণ করে চলার পরামর্শও দেন তাঁরা।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘অপরাজেয় বেগম খালেদা জিয়া’ শীর্ষক এই সভায় বক্তারা এই মন্তব্য করেন। এসময় সকল রাজনীতিবিদদের বেগম জিয়ার মানসিকতা ধারণ করার আহ্বানও জানান।

বক্তারা মরহুম নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও চারিত্রিক দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা বলেন, দীর্ঘ সময় কারাবাস ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সহ্য করেও তিনি কখনো প্রতিহিংসার পথ বেছে নেননি বরং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তার শেষ ভাষণে তিনি উদারতা ও জাতীয় ঐক্যের যে ডাক দিয়েছিলেন তা আগামীর বাংলাদেশ গড়ার মূল পাথেয় হয়ে থাকবে।

ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র সবকিছুই আমাদের জন্য মূল্যবান। কিন্তু ভবিষ্যৎ হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, আগামী নেতৃত্বকে বলব যে খালেদা জিয়ার শেষ বাণী হলো জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। আমরা যেন এটা সবার অন্তরের ভেতরে উপলব্ধি করি।

খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থেই দেশনেত্রী হয়ে উঠেছিলেন: শোকসভায় বক্তারা

বাংলাদেশকে আমরা ভালোবাসি, বাংলাদেশকে আমরা অন্তর থেকে ভালোবাসি মন্তব্য করে মাহফুজ আনাম বলেন, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির এক সভায় ভাষণ দিলেন এবং সেখানে উনি যে মূল বাণীটা আমাদেরকে দিলেন– ধ্বংস নয়, প্রতিরোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, প্রতিশোধ নয়।

‘উনি কিন্তু ইজিলি বলতে পারতেন যে আমি প্রতিশোধ চাই না কিন্তু আমি ন্যায়বিচার চাই, আমার বিরুদ্ধে যা করা হয়েছে। এটা উনি বললেন না। এই যে উদারতা তিনি সেদিন দেখিয়েছেন এটা অসাধারণ গুণ।’

তিনি বলেন, আমি মনে করি বেগম জিয়ার এই উদারতা যদি আমাদের রাজনীতিতে আমরা এখন অন্তঃস্থ করতে পারি, যদি আমরা নিজের মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের একটা বিরাট অবদান থাকবে।

যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, যে করেই হোক ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস সবাইকে আশ্বাস দিচ্ছেন এবং বারবার বলছেন যে ওই নির্বাচন হবে একটি আনন্দমুখর, উৎসবের দিন। তিনি নিজেও তা প্রত্যাশা করেন। তবে এর জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

2

শফিক রেহমান বলেন, তিনি আশা করেন ভোটের দিন পুলিশ বাহিনী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ভোটকেন্দ্র যেন সত্যিকার অর্থে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এবং সবাই সপরিবারে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন। তিনি বলেন, আজকের এই শোকসভাকে অর্থবহ করতে হলে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সহিংসতার মাধ্যমে যেন গোটা জাতির নির্বাচনী আশা নষ্ট না হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, খালেদা জিয়া কেবল একটি জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। যা দলমত নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের তার জানাজায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, মানুষ ও রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার যে গুণটি আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে, তা হলো তার রুচিশীলতা ও পরিমিতিবোধ। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা ও সংযমের ঘাটতি প্রকট। তখন আমি লক্ষ্য করেছি- তিনি নিরন্তর ও বিনা ব্যতিক্রমে একজন রাজনীতিক হিসেবে, নিজের ওপর ও তার পরিবারের ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে যে আঘাত ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে, সেসবের প্রতিক্রিয়ায় কখনোই প্রকাশ্যে নিজের বেদনা, ক্ষোভ কিংবা নিন্দাসূচক কোনো বক্তব্য উচ্চারণ করেননি।’

6

‘আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব সহজ কথা হতে পারে। কিন্তু এই যে সংযম, পরিমিতিবোধ ও আত্মমর্যাদা- রাজনীতিতে অনেক অনুসারী থাকতে পারে, অনেক মত ও পথদর্শন থাকতে পারে, কিন্তু যিনি যেই রাজনীতির, যেই সংস্কৃতিরই অনুসারী হন না কেন, এই বিষয়টি আজকের বাংলাদেশের অসহিষ্ণুতার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি,’ যোগ করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার জানাজা প্রসঙ্গে নূরুল কবীর জানান, সেদিন বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বিএনপির এক নেতা লাখ লাখ মানুষকে কথা দিয়েছিলেন যে তাদের রাজনীতি খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত হবে। এই কথাটি রাখতে বিএনপিকে অনুরোধ করেন তিনি।

আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সংগ্রামের পতাকা আজ তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। এটি যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি এক গভীর দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জেরও বিষয়।’

বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের সন্তান হওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ভয় ও শঙ্কার বিষয়ও। কারণ বাংলাদেশের মানুষ সবসময় তারেক রহমানকে তার বাবা ও মায়ের সঙ্গে তুলনা করবে। এই তুলনা অত্যন্ত কঠিন- যে কোনো মানুষের জন্যই।

আমার দেশ সম্পাদক বলেন, বাংলাদেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে মাত্র দুজন নেতা-নেত্রী জন্মেছেন, যাদের সমতুল্য হওয়া কঠিন। আর তারা যদি বাবা-মা হন, তাহলে সেই সন্তানদের জন্য দায়িত্ব আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’ আজ শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার সেই অবিস্মরণীয় পতাকা, সেই শক্তি ও স্বাধীনতার পতাকা তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে।

তিনি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেন, আল্লাহ যেন তারেক রহমানকে এই ঐতিহাসিক পতাকা বহন করার শক্তি ও সামর্থ্য দান করেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের শত বছরের ইতিহাসে একমাত্র স্বামী-স্ত্রী, যারা সারাজীবন জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন। তারা যে জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন, সেই একই জনপ্রিয়তা নিয়েই আল্লাহর কাছে ফিরে গেছেন।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে একই পরিবার থেকে স্বামী ও স্ত্রী- দুজনই পুরো জাতির সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছেন, এরকম উদাহরণ পৃথিবীতে নেই। এটি একটি সম্পূর্ণ ইউনিক ঘটনা, যা আমাদের মনে রাখা দরকার।’

লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ বলেন, এই জনপদের মানুষ তাকে মনে রাখবে তার ত্যাগ, সততা, অত্যাচার সহ্য করার অপরিসীম ক্ষমতাসহ নানা গুণের কারণে। তার দেওয়া মন্ত্রগুলো ধারণ করলে তার দল এবং দেশ রক্ষা পাবে, অন্যথায় পাবে না। তার মৃত্যুতে সময় এবং আগামীর মৃত্যু হয়নি, বরং খালেদা জিয়া এবং তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় চরম অবহেলা ও ইচ্ছাকৃত গাফিলতির অভিযোগ করে তার চিকিৎসা দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি ওষুধ তার লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জনের’ মতো কাজ করেছে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, অনেকেই প্রশ্ন করেন, ম্যাডামকে কি স্লো পয়জন করা হয়েছে? আমার উত্তর হচ্ছে, ‘মেথোট্রেক্সেট’ ছিল সেই ওষুধ, যা তার ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে দ্রুত লিভার সিরোসিসে রূপান্তরিত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে এটি তার লিভারের জন্য ধীরে ধীরে বিষের মতো কাজ করেছে।

তিনি বলেন, আজ দেশের লক্ষ-কোটি মানুষের বুকের ভেতরে গভীর এক আফসোস কাজ করছে। সারাজীবন গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকার করা মানুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন! যদি দেখতে পেতেন মানুষ নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে!

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. সিদ্দ্কিী বলেন, ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আমরা, বর্তমান মেডিকেল বোর্ড, তার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করি। ভর্তি হওয়ার পরপরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা বিস্ময় ও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখতে পাই যে ম্যাডাম লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত।

তিনি বলেন, এর আগের চিকিৎসা ছাড়পত্র অনুযায়ী রিউমাটয়েড আর্থাইটিসের জন্য তাকে নিয়মিত ‘মেথোট্রেক্সেট’ নামের ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছিল, যা হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেও চালু রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে এই ওষুধ বন্ধ করে দিই।

ডা. সিদ্দিকী বলেন, বেগম খালেদা জিয়া একই সঙ্গে ফ্যাটি লিভার ডিজিজেও আক্রান্ত ছিলেন। এমন অবস্থায় নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট করা এবং প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা ছিল অত্যাবশ্যক।

তিনি বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ আসার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি, এমনকি মেথোট্রেক্সেটও বন্ধ করেনি।

খালেদা জিয়াকে স্লো পয়জন দেওয়া হয়েছে: ডা. সিদ্দিকী

তিনি বলেন, তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে বেগম খালেদা জিয়া সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে রাজি হননি। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তার আস্থাভাজন চিকিৎসক দিয়ে বেডসাইডে ‘পয়েন্ট অব কেয়ার আল্ট্রাসাউন্ড’ করা যেত, অথবা অন্তত মেথোট্রেক্সেট বন্ধ করা ছিল ন্যূনতম দায়িত্ব।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দ্কিী অভিযোগ করে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় এ ধরনের অবহেলা, লিভার ফাংশনের দ্রুত অবনতি তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটি ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা। এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এটি তাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ডায়াবেটিস ও আর্থাইটিসের চিকিৎসায়ও অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের কাছে রয়েছে।

এ ঘটনায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে আইনগত তদন্তের দাবি জানিয়ে অধ্যাপক ডা. সিদ্দিকী তিনটি বিষয় উল্লেখ করেন– সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা কারা ছিলেন এবং কী যোগ্যতায় তারা চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন; চিকিৎসাকালে কোন কোন চিকিৎসক সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং সেখানে অবহেলার প্রমাণ আছে কিনা; এবং বেগম খালেদা জিয়া কেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের চিকিৎসা দলে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি বা কারা এতে বাধা দিয়েছিল।

সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নথি আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ডা. সিদ্দিকী বলেন, আমরা আশা করি, সরকার ম্যাডামের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেবে। আমরা জানি, ন্যায়বিচারে বিলম্ব মানেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া।

লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আব্দুস সালাম বলেন, “বিএনপি বিশ বছর অত্যাচারের পরও জনগণের ভালোবাসায় টিকে রয়েছে। এর মূল কারণ বেগম জিয়ার দৃঢ়চেতা রাজনীতি।”

ব্যবসায়ী সিমিন রহমান বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া মানুষ হিসেবে আপসহীন ছিলেন। দেশের অর্থনীতিতে তার অবদান ছিল। তিনি বলতেন, ব্যবসা করতে হবে নৈতিকতার সঙ্গে। আমার বাবা লতিফুর রহমানের কাছ থেকে শুনেছি, বেগম খালেদা জিয়া সঠিকভাবে ব্যবসা করতে বলেছেন। তার জান্নাত কামনা করছি।”

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে। শিল্পায়ন হয়েছে।”

সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির বলেন, “বাংলাদেশ রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম খালেদা জিয়া। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা। কঠিন সময়েও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ধ্বংস নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমার বিবেচনায় তিনি বিচক্ষণ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার দাবি জানাই।”

8

বেগম খালেদা জিয়া স্মরণে নাগরিক শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন। উপস্থাপনায় ছিলেন আশরাফ কায়সার এবং কাজী জেসিন। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক শোকসভায় সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা।

দলের সাবেক চেয়ারপারসনের শোকসভায় যোগ দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা।

কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শোকসভা শুরু হয়। এরপর খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকবার্তা পাঠ করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন। এরপর সভায় একে একে বক্তব্য দেন লেখক ফাহাম আব্দুস সালাম, পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, খালেদা জিয়ার চিকিৎসক এফ এম সিদ্দিকী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী দেবাশীষ রায়, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, জ্যেষ্ঠ সম্পাদক শফিক রেহমান, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ডিপিআইয়ের সভাপতি আব্দুস সাত্তার দুলাল, সাবেক কূটনীতিক আনোয়ার হাশিম, আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ, লেখক ও গবেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন। এরপর খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে স্মরণসভা শেষ হয়।