আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত কোনো সরকারের অধীনে তিনি দেশে ফিরবেন না। তিনি আপাতত ভারতে থাকার পরিকল্পনা নিয়েছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। সেখান থেকে বুধবার (২৯ অক্টোবর) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমনটা জানান। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশ পরিচালনা করছে এবং আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের অঙ্গীকার করেছে। দেশে বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
ই-মেইলে রয়টার্সকে দেওয়া জবাবে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি দেশে ফিরতে চাই, তবে শর্ত একটাই- সেখানে বৈধ সরকার থাকতে হবে, সংবিধান অটুট থাকতে হবে এবং প্রকৃত আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা কেবল অন্যায়ই নয়, এটি আত্মঘাতীও বটে। আওয়ামী লীগের লাখ লাখ সমর্থক আগামী বছরের জাতীয় নির্বাচন বয়কট করবে।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, পরবর্তী সরকারের নির্বাচনী বৈধতা থাকা দরকার। লাখ লাখ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, তাই এখনকার অবস্থায় তারা ভোট দেবে না। যদি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা চান, তবে কোটি কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা চলবে না।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি বা তার পরিবারের কেউ আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নাও থাকতে পারেন।
শেখ হাসিনা বলেন, এটা সত্যিই আমি বা আমার পরিবারকে নিয়ে নয়। বাংলাদেশ যে ভবিষ্যৎ চায়, তা অর্জন করতে হলে সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই হবে। কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবার দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না।
তিনি বলেননি যে তিনি বা তার পক্ষে অন্য কেউ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সাথে কোনও আড়ালে আলোচনা করছেন কিনা।
দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি জানান, সরকারে হোক বা বিরোধীদলে হোক- দল ভূমিকা নেবে, এবং দলের নেতৃত্ব তার পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হবে না। তিনি বলেন, এটা আমার বা আমার পরিবারের ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের জন্য যে ভবিষ্যৎ আমরা সবাই চাই, সেজন্য সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসতেই হবে। কোনো এক ব্যক্তি বা পরিবার আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের বিষয়ে ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান। তার ভাষ্য, আমি প্রতিটি প্রাণহানিতে শোকাহত, তবে আমি কোনো ব্যক্তিগত হত্যার আদেশ দিইনি। তিনি দাবি করেন, বেশির ভাগ সহিংসতা ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাঠ পর্যায়ের অসংগতি বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের ফলে এবং এখানে তার ব্যক্তিগতভাবে দায় নেই।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যেখানে বলা হয়েছে, মাত্র তিন সপ্তাহে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছে—সেই তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, ‘এই সংখ্যা অতিরঞ্জিত। আমরা বরং প্রাণহানি কমাতে ব্যবস্থা নিয়েছি।’
রয়টার্স বলছে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপিকে প্রধান দল হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটির বেশি। এমন প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা ভোটারদের বড় অংশকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজনকে গণতন্ত্রবিরোধী ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ মনে করেন।
নিজের উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি চাই, মানুষ আমাকে স্মরণ করুক সেই নেতা হিসেবে, যিনি সামরিক শাসনের পর দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন, এবং যিনি লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেই অর্জনগুলো ঝুঁকির মুখে।’
তবে তার এই বক্তব্য তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের আগের মন্তব্যের সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন। ওয়াশিংটনে বসবাসরত সজীব ওয়াজেদ গত বছর রয়টার্সকে বলেছিলেন, অনুরোধ করা হলে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থানে সহিংস দমন-পীড়ন ও আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুমসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলমান। এর আগে ট্রাইব্যুনাল গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর যেকোনো ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য’ প্রকাশ বা প্রচার নিষিদ্ধ করে। সূত্র : রয়টার্স।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 



















