Dhaka মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কদর নেই হাতে বোনা ঝাঁকি জালের

বাউফল উপজেলা (পটুয়াখালী ) থেকে নুরুল ইসলাম সিদ্দিকী (মাসুম)

একটা সময় পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটা পরিবারের কাছে হাতে বোনা ঝাঁকি জাল ছিল নিত্য প্রয়োজনীয়। কারণ জাল দিয়ে বাড়ির পুকুর কিংবা কোলা-বিলে মাছ ধারার একটা প্রবণতা ছিল অধিকাংশ পরিবারের। কিন্তু কালের আবর্তে তা হারিয়ে যেতে বসেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন বংশপরম্পরায় জাল বোনার কারিগরেরা।

সরজমিন দেখা গেছে, উপজেলার কালাইয়া বাজারের বৃহৎ জালের বাজার। হাটে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কারিগরদের নিপুন হাতে বোনা ঝাঁকি জাল, মই ঝাল ও ধর্মজাল। ক্রেতার অপেক্ষায় বসে রয়েছেন জালের কারিগররা। তবে তেমন দেখা মিলছে কাক্সিক্ষত ক্রেতার। এতে হতাশা নিয়েই বাড়ি ফিরছেন হাটে জাল বিক্রি করতে আসা কারিগর ও ব্যবসায়ীরা।

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জালের প্রকারভেদে দামও ভিন্ন ভিন্ন। ৪হাত লম্ব ঝাঁকি জালের দাম হাঁকানো হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, ৫ হাত লম্ব ঝাঁকি জালের দাম ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, ৬ হাত লম্ব ঝাঁকি জালের দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা, ৭ হাত লম্ব ঝাঁকি জালের দাম ১ হাজার ৮০০-২ হাজার ২০০ টাকা। ১০ হাত ধর্মজালের দাম ৩ হাজার ৫০০ টাকা ও ১৫ হাত ধর্মজালের দাম ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং মই জালের দাম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তবে হাটে তুলনামুলক জালের ক্রেতার সংখ্যা কম।

হাটে জাল বিক্রি করতে আসা উপজেলার দাশপাড়া গ্রামের আলামিন মোল্লা বলেন, তার বাপ-দাদা জালের কারিগর ছিলেন। তিনিও বংশপরম্পরায় জাল বুনছেন। এসব জাল হাটে-বাজারে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু এখন আর হাতে বোনা জালের কদর নাই।
বড়ডালিমা গ্রামের আয়েনআলী মাঝি বলেন,‘ বছরের ৭ থেকে ৮ মাস জালের চহিদা থাকে না। বর্ষা মৌসুমে ক্রেতা বেড়ে থাকে। তবে আগের মত জালের কদর নাই। এক দিকে খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুর- ডোবায় তেমন মাছ নেই, অন্যদিকে আধুনিকতার যুগে মানুষের ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরার চর্চা নেই। যে কারণে জালের কদর কমছে।

শৌলা গ্রামের জাল বিক্রেতা মো. ইদ্রিস মিয়া বলেন, এক সময় গ্রামের মানুষ সুযোগ পেলেই জাল নিয়ে নদী খালে মাছ ধরতে নেমে যেতেন। এ যুগের ছেলে-পেলেরা ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরতেই জানেন না। যে কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ঝাঁকি জাল হারিয়ে যেতে বসেছে।

পরিবেশ নিয়ে গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন ’সেইভ দি বার্ড এ্যান্ড বি’ নামে একটি বেসরকারী সংস্থা। ওই সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এম এ বাশার বলেন, এক সময় খালে বিলে ডোবা নালায় প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। গ্রামের মানুষ এসব মাছ ধরে পারিবারিক চাহিদা পূরণ সহ বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করত। কয়েক দশক ধরে কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত সার কিটনাশকের ব্যবহার বহুগুন বেড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক খালে বিলের পানিতে মিশে দেশীয় প্রজাতির মাছ ধ্বংশ হচ্ছে। একই ভাবে বিলে-খালে নিষিদ্ধ ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও মাছের রেনু পোনা ধ্বংস করা হচ্ছে। যে কারণে দিনদিন দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ঝাঁকি জালের ব্যবহারও কমেছে। এছাড়া এ জালের ব্যবহার কমার পিছনে আধুনিকতার প্রভাবও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

দেশীয় প্রজাতির মাছ কমছে স্বীকার করেছেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, নিষিদ্ধ জাল ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ ও রেনু ধ্বংস হচ্ছে। এসব নিষিদ্ধ জালে ব্যবহার বন্ধ করতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। এসব জাল পুড়িয়ে ধ্বংস সহ জেল জরিমানাও করছি। তবে কাজ হচ্ছে না। সরকারের এসব জালের উৎপাদন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া উচিত।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বরদাস্ত করা হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কদর নেই হাতে বোনা ঝাঁকি জালের

প্রকাশের সময় : ০৩:২৮:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ জুন ২০২৫

বাউফল উপজেলা (পটুয়াখালী ) থেকে নুরুল ইসলাম সিদ্দিকী (মাসুম)

একটা সময় পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটা পরিবারের কাছে হাতে বোনা ঝাঁকি জাল ছিল নিত্য প্রয়োজনীয়। কারণ জাল দিয়ে বাড়ির পুকুর কিংবা কোলা-বিলে মাছ ধারার একটা প্রবণতা ছিল অধিকাংশ পরিবারের। কিন্তু কালের আবর্তে তা হারিয়ে যেতে বসেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন বংশপরম্পরায় জাল বোনার কারিগরেরা।

সরজমিন দেখা গেছে, উপজেলার কালাইয়া বাজারের বৃহৎ জালের বাজার। হাটে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কারিগরদের নিপুন হাতে বোনা ঝাঁকি জাল, মই ঝাল ও ধর্মজাল। ক্রেতার অপেক্ষায় বসে রয়েছেন জালের কারিগররা। তবে তেমন দেখা মিলছে কাক্সিক্ষত ক্রেতার। এতে হতাশা নিয়েই বাড়ি ফিরছেন হাটে জাল বিক্রি করতে আসা কারিগর ও ব্যবসায়ীরা।

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জালের প্রকারভেদে দামও ভিন্ন ভিন্ন। ৪হাত লম্ব ঝাঁকি জালের দাম হাঁকানো হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, ৫ হাত লম্ব ঝাঁকি জালের দাম ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, ৬ হাত লম্ব ঝাঁকি জালের দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা, ৭ হাত লম্ব ঝাঁকি জালের দাম ১ হাজার ৮০০-২ হাজার ২০০ টাকা। ১০ হাত ধর্মজালের দাম ৩ হাজার ৫০০ টাকা ও ১৫ হাত ধর্মজালের দাম ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং মই জালের দাম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তবে হাটে তুলনামুলক জালের ক্রেতার সংখ্যা কম।

হাটে জাল বিক্রি করতে আসা উপজেলার দাশপাড়া গ্রামের আলামিন মোল্লা বলেন, তার বাপ-দাদা জালের কারিগর ছিলেন। তিনিও বংশপরম্পরায় জাল বুনছেন। এসব জাল হাটে-বাজারে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু এখন আর হাতে বোনা জালের কদর নাই।
বড়ডালিমা গ্রামের আয়েনআলী মাঝি বলেন,‘ বছরের ৭ থেকে ৮ মাস জালের চহিদা থাকে না। বর্ষা মৌসুমে ক্রেতা বেড়ে থাকে। তবে আগের মত জালের কদর নাই। এক দিকে খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুর- ডোবায় তেমন মাছ নেই, অন্যদিকে আধুনিকতার যুগে মানুষের ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরার চর্চা নেই। যে কারণে জালের কদর কমছে।

শৌলা গ্রামের জাল বিক্রেতা মো. ইদ্রিস মিয়া বলেন, এক সময় গ্রামের মানুষ সুযোগ পেলেই জাল নিয়ে নদী খালে মাছ ধরতে নেমে যেতেন। এ যুগের ছেলে-পেলেরা ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরতেই জানেন না। যে কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ঝাঁকি জাল হারিয়ে যেতে বসেছে।

পরিবেশ নিয়ে গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন ’সেইভ দি বার্ড এ্যান্ড বি’ নামে একটি বেসরকারী সংস্থা। ওই সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এম এ বাশার বলেন, এক সময় খালে বিলে ডোবা নালায় প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। গ্রামের মানুষ এসব মাছ ধরে পারিবারিক চাহিদা পূরণ সহ বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করত। কয়েক দশক ধরে কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত সার কিটনাশকের ব্যবহার বহুগুন বেড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক খালে বিলের পানিতে মিশে দেশীয় প্রজাতির মাছ ধ্বংশ হচ্ছে। একই ভাবে বিলে-খালে নিষিদ্ধ ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও মাছের রেনু পোনা ধ্বংস করা হচ্ছে। যে কারণে দিনদিন দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ঝাঁকি জালের ব্যবহারও কমেছে। এছাড়া এ জালের ব্যবহার কমার পিছনে আধুনিকতার প্রভাবও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

দেশীয় প্রজাতির মাছ কমছে স্বীকার করেছেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, নিষিদ্ধ জাল ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ ও রেনু ধ্বংস হচ্ছে। এসব নিষিদ্ধ জালে ব্যবহার বন্ধ করতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। এসব জাল পুড়িয়ে ধ্বংস সহ জেল জরিমানাও করছি। তবে কাজ হচ্ছে না। সরকারের এসব জালের উৎপাদন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া উচিত।