Dhaka বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এআইয়ের মাধ্যমে ছড়ানো বিদ্বেষ বন্ধে ইসি নিষ্ক্রিয় : ড. দেবপ্রিয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো নির্বাচনের আগে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যায় এআই ব্যবহার করে নানা ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্যাক্ট চেকিং বা যাচাই–বাছাই ছাড়া এসব কনটেন্ট সত্য না বানানো, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। এভাবেই অপতথ্য ও সহিংসতার উপকরণ ছড়ানো হচ্ছে, যা এ নির্বাচনে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, এআইয়ের মাধ্যমে সহিংসতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তা প্রতিহত করতে নির্বাচন কমিশন কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ডিজিটাল সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ডিজিটালাইজেশন আমাদের প্রগতিশীল করেছে, তবে এটি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও প্রথাগত কর্মসংস্থানে সমস্যা হচ্ছে। আগস্ট মাসের আন্দোলনে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এর মাধ্যমে বোঝা যায় এর প্রয়োজনীয়তা। ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে নৈতিক পরাজয় হয়েছিল।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতা ও ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, অথচ তা প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা ইচ্ছা লক্ষ্য করা যায়নি। একইভাবে এই অপব্যবহার রোধে বর্তমান সরকারও উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ক্রমাগত দাবি জানানো হচ্ছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহারের ফলে কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমেছে, তবে এটি টেকসই করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। এজন্য একটি একীভূত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে, যা নির্বাচন কমিশন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থেকে একটি স্বায়ত্তশাসিত, নজরদারিভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে নতুন সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্সকে আগামী সরকারকে বৈধতা দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো আগামী নির্বাচনে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে জনগণের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা’ শীর্ষক ধারাবাহিক আয়োজনের অংশ হিসেবে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ বিষয়ক এক আলোচনা সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, ঢাকা চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলীলী, বারভিডা’র সাবেক সভাপতি আবদুল হক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশের (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, সিটি ব্যাংক পিএলসির অ্যাসোসিয়েট রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট, উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা, উদ্যোক্তা তাজমিন নাসরিন, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভার্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানের সূচনায় জিল্লুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ আমরা গণঅভ্যুত্থানের পরপরই শুরু করেছি। অনেকেই প্রশ্ন করেন—আমরা যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করি, সেগুলো কি নীতি নির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলে? বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে থিংক ট্যাংকগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না; বরং সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক সময় বৈরী হয়ে ওঠে। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উপস্থিত হলে দেখা যায়, তারা শোনার চেয়ে বলতেই বেশি আগ্রহী হন।

তিনি বলেন, গত এক দশকে ‘ডিজিটাল’ শব্দটি আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু কেবল কারো হাতে একটি স্মার্টফোন থাকলেই দেশ ডিজিটাল হয়ে যায় না। বরং এই ডিজিটালাইজেশনের আড়ালেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে; এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও বিপুল অর্থ লোপাট হয়েছে, যা আমরা ঠেকাতে পারিনি। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বলেন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য, কিন্তু উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর আমাদের আস্থা কমে গেছে; ফলে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। অনেক ক্ষেত্রে সোশাল মিডিয়া থেকে পাওয়া যাচাইহীন তথ্যই মূলধারার মিডিয়ায় প্রচারিত হয়ে যাচ্ছে।

শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, দুর্নীতি ও ঘুষ থেকে বেরিয়ে আসার একটি কার্যকর পথ হলো ডিজিটালাইজেশন। কারখানায় সিসিটিভি স্থাপনের ফলে স্বচ্ছতা ও নজরদারি বেড়েছে। আগে কারখানায় ঢোকার সময় সই করতে হতো, পরে পাঞ্চ কার্ড, আর এখন ডিজিটাল কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে ফলে কাজ অনেক সহজ হয়েছে। প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে কোনো মেশিন নষ্ট হলে এখন চীনা প্রস্তুতকারকের সঙ্গে ভিডিও কলে বসেই তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের কাজে লাগাতে হবে, কারণ ব্যয়বহুল বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সক্ষমতা অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই।

ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, আমরা যতই অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশনের কথা বলি না কেন, মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনাও মূলত ব্যক্তিগত অসচেতনতার ফল। এনবিআর অটোমেশনের কাজ ভিয়েতনামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল, যারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা নিয়ে চলে গেছে—আমরা কিছুই করতে পারিনি। সুন্দরবনের বাঘকে যেমন ডিজিটাল হতে বলা যায় না, তেমনি মানসিকতা না বদলালে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা থাকে না।

তিনি বলেন, আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস কমিউনিকেশন পড়াই, কিন্তু শিক্ষার্থীরা যোগাযোগের মৌলিক বিষয়ই শিখতে চায় না। সেখানে শুধু ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করে লাভ হবে না। নীতিগতভাবে আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতি দরকার, যার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে। পাশের দেশগুলো থেকে লোকজন সিলিকন ভ্যালিতে শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করছে, অথচ আমরা পারছি না—কেন পারছি না, তা নিয়ে ভাবা জরুরি।

আসিফ ইব্রাহিম বলেন, যে তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নীতি প্রণয়ন করি, তার নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু—এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকেও আধুনিক করতে হবে। ই-কমার্স খাতে আমাদের অবস্থা এখনো সন্তোষজনক নয়। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ জরুরি। উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই।

এম এ বাকী খলীলী বলেন, নতুন সরকার যেন বিদ্যমান সুযোগগুলো গ্রহণ করে। প্রচলিত ধারা অনুসরণ না করে নতুনভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। অর্থনীতি সচল রাখতে ডিজিটালাইজেশন অপরিহার্য। উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের ফিনটেক আছে, তবে এডটেকের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল শিক্ষা কতটা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেটি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। সাপ্লাই টু ফাইন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে। দেশের তরুণদের কেন্দ্র করেই আমাদের ডিজিটাল গ্রোথ গড়ে তুলতে হবে।

সবুর খান বলেন, আমাদের মূল সমস্যা হলো—আমরা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করছি না। আমার মনে হয়, আমরা ধীরে ধীরে একটি অসুস্থ জাতিতে পরিণত হচ্ছি। গণমাধ্যমের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য নেই। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। রাজনীতিবিদরা অনেক সময় অন্যের কথা শুনতে চান না। ২০০২ সালে কম্পিউটারের ওপর কর আরোপ করে একটি সম্ভাবনাময় খাতকে কার্যত গলা টিপে ধরা হয়েছিল। পরে দীর্ঘ চেষ্টার পর সেই কর প্রত্যাহার করা হয়। গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।

 

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

এআইয়ের মাধ্যমে ছড়ানো বিদ্বেষ বন্ধে ইসি নিষ্ক্রিয় : ড. দেবপ্রিয়

প্রকাশের সময় : ০৬:৫৪:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো নির্বাচনের আগে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যায় এআই ব্যবহার করে নানা ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্যাক্ট চেকিং বা যাচাই–বাছাই ছাড়া এসব কনটেন্ট সত্য না বানানো, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। এভাবেই অপতথ্য ও সহিংসতার উপকরণ ছড়ানো হচ্ছে, যা এ নির্বাচনে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, এআইয়ের মাধ্যমে সহিংসতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তা প্রতিহত করতে নির্বাচন কমিশন কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ডিজিটাল সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ডিজিটালাইজেশন আমাদের প্রগতিশীল করেছে, তবে এটি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও প্রথাগত কর্মসংস্থানে সমস্যা হচ্ছে। আগস্ট মাসের আন্দোলনে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এর মাধ্যমে বোঝা যায় এর প্রয়োজনীয়তা। ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে নৈতিক পরাজয় হয়েছিল।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতা ও ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, অথচ তা প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা ইচ্ছা লক্ষ্য করা যায়নি। একইভাবে এই অপব্যবহার রোধে বর্তমান সরকারও উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ক্রমাগত দাবি জানানো হচ্ছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহারের ফলে কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমেছে, তবে এটি টেকসই করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। এজন্য একটি একীভূত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে, যা নির্বাচন কমিশন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থেকে একটি স্বায়ত্তশাসিত, নজরদারিভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে নতুন সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্সকে আগামী সরকারকে বৈধতা দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো আগামী নির্বাচনে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে জনগণের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা’ শীর্ষক ধারাবাহিক আয়োজনের অংশ হিসেবে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ বিষয়ক এক আলোচনা সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, ঢাকা চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলীলী, বারভিডা’র সাবেক সভাপতি আবদুল হক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশের (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, সিটি ব্যাংক পিএলসির অ্যাসোসিয়েট রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট, উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা, উদ্যোক্তা তাজমিন নাসরিন, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভার্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানের সূচনায় জিল্লুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ আমরা গণঅভ্যুত্থানের পরপরই শুরু করেছি। অনেকেই প্রশ্ন করেন—আমরা যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করি, সেগুলো কি নীতি নির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলে? বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে থিংক ট্যাংকগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না; বরং সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক সময় বৈরী হয়ে ওঠে। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উপস্থিত হলে দেখা যায়, তারা শোনার চেয়ে বলতেই বেশি আগ্রহী হন।

তিনি বলেন, গত এক দশকে ‘ডিজিটাল’ শব্দটি আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু কেবল কারো হাতে একটি স্মার্টফোন থাকলেই দেশ ডিজিটাল হয়ে যায় না। বরং এই ডিজিটালাইজেশনের আড়ালেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে; এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও বিপুল অর্থ লোপাট হয়েছে, যা আমরা ঠেকাতে পারিনি। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বলেন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য, কিন্তু উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর আমাদের আস্থা কমে গেছে; ফলে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। অনেক ক্ষেত্রে সোশাল মিডিয়া থেকে পাওয়া যাচাইহীন তথ্যই মূলধারার মিডিয়ায় প্রচারিত হয়ে যাচ্ছে।

শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, দুর্নীতি ও ঘুষ থেকে বেরিয়ে আসার একটি কার্যকর পথ হলো ডিজিটালাইজেশন। কারখানায় সিসিটিভি স্থাপনের ফলে স্বচ্ছতা ও নজরদারি বেড়েছে। আগে কারখানায় ঢোকার সময় সই করতে হতো, পরে পাঞ্চ কার্ড, আর এখন ডিজিটাল কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে ফলে কাজ অনেক সহজ হয়েছে। প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে কোনো মেশিন নষ্ট হলে এখন চীনা প্রস্তুতকারকের সঙ্গে ভিডিও কলে বসেই তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের কাজে লাগাতে হবে, কারণ ব্যয়বহুল বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সক্ষমতা অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই।

ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, আমরা যতই অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশনের কথা বলি না কেন, মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনাও মূলত ব্যক্তিগত অসচেতনতার ফল। এনবিআর অটোমেশনের কাজ ভিয়েতনামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল, যারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা নিয়ে চলে গেছে—আমরা কিছুই করতে পারিনি। সুন্দরবনের বাঘকে যেমন ডিজিটাল হতে বলা যায় না, তেমনি মানসিকতা না বদলালে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা থাকে না।

তিনি বলেন, আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস কমিউনিকেশন পড়াই, কিন্তু শিক্ষার্থীরা যোগাযোগের মৌলিক বিষয়ই শিখতে চায় না। সেখানে শুধু ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করে লাভ হবে না। নীতিগতভাবে আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতি দরকার, যার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে। পাশের দেশগুলো থেকে লোকজন সিলিকন ভ্যালিতে শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করছে, অথচ আমরা পারছি না—কেন পারছি না, তা নিয়ে ভাবা জরুরি।

আসিফ ইব্রাহিম বলেন, যে তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নীতি প্রণয়ন করি, তার নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু—এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকেও আধুনিক করতে হবে। ই-কমার্স খাতে আমাদের অবস্থা এখনো সন্তোষজনক নয়। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ জরুরি। উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই।

এম এ বাকী খলীলী বলেন, নতুন সরকার যেন বিদ্যমান সুযোগগুলো গ্রহণ করে। প্রচলিত ধারা অনুসরণ না করে নতুনভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। অর্থনীতি সচল রাখতে ডিজিটালাইজেশন অপরিহার্য। উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের ফিনটেক আছে, তবে এডটেকের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল শিক্ষা কতটা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেটি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। সাপ্লাই টু ফাইন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে। দেশের তরুণদের কেন্দ্র করেই আমাদের ডিজিটাল গ্রোথ গড়ে তুলতে হবে।

সবুর খান বলেন, আমাদের মূল সমস্যা হলো—আমরা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করছি না। আমার মনে হয়, আমরা ধীরে ধীরে একটি অসুস্থ জাতিতে পরিণত হচ্ছি। গণমাধ্যমের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য নেই। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। রাজনীতিবিদরা অনেক সময় অন্যের কথা শুনতে চান না। ২০০২ সালে কম্পিউটারের ওপর কর আরোপ করে একটি সম্ভাবনাময় খাতকে কার্যত গলা টিপে ধরা হয়েছিল। পরে দীর্ঘ চেষ্টার পর সেই কর প্রত্যাহার করা হয়। গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।