Dhaka শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ‘সৎ মায়ের’ মতো আচরণ করা হয়েছে : জামায়াত আমির

পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি : 

দেশের খাদ্য যোগানে উত্তরবঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রাখলেও এ অঞ্চলকে ‘ইচ্ছে করে’ বঞ্চিত রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে উত্তরবঙ্গ গরিব নয়, গরিব করে রাখা হয়েছে; সেই বঞ্চনার সাক্ষী হতে এসেছি। সৎ মায়ের মতো উত্তরবঙ্গের সাথে আচরণ করা হয়েছে। এই উত্তরবঙ্গ আমাদের কলিজার অংশ, এই উত্তরবঙ্গ দেশকে খাদ্য এবং পুষ্টি সরবরাহ করে। আর সেই উত্তরবঙ্গকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে ইচ্ছা করে।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) ১০ দলীয় জোটের ঢাকার বাইরে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিনের প্রথম কর্মসূচিতে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠের জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গকে আগামীতে আমরা আর কাউকে পিছিয়ে রাখতে চাই না। আপনাদের সকলের হাতে মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে চাই। আমাদের প্রত্যেকটা যুবক-যুবতী, প্রত্যেকটা নাগরিককে আমরা দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে তৈরি করতে চাই। গোটা উত্তরবঙ্গকে আমরা কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী বানাতে চাই। বন্ধ চিনি কলগুলো খুলে দিতে চাই, শ্রমিকদেরকে কর্ম ফিরিয়ে দিতে চাই।

জামায়াত আমির বলেন, ভাই আমাদের কাছে কোনো কার্ড নাই। আপনারা সবাই ভাই-বোনেরা আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে আমরা একটা ভালোবাসার কার্ড গুঁজে দিতে চাই। আপনাদের সেই ভালোবাসা দিয়ে আমরা একটা বঞ্চনা, অবিচার এবং দায়-দেনা মুক্ত একটা বাংলাদেশ গড়তে চাই। কারো দয়ার পাত্র হয়ে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বসবাস করবে, তা আমরা দেখতে চাই না। কে কার উপর দয়া করবে? জনগণের ট্যাক্সের পয়সা নিয়ে পরের ধনে পোদ্দারি এ আমরা করব না।

শফিকুর রহমান বলেন, মানুষ বলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। ওই টেকনাফের উন্নয়ন জোয়ার আর আসতে পারে না তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। আমরা এবার বলব তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ। এতদিন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছিল, এখন ব্যালেন্স হওয়া দরকার—তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ।

জামায়াত আমির বলেন, দেশে ইনসাফ থাকলে দুর্নীতি ও টাকার পাচার হতো না। আওয়ামী শাসনামলে আয়নাঘর তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হয়েও রেহাই পায়নি অনেকে।

জনগণ এবার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কে জয়যুক্ত করতে মুখিয়ে আছে জোর দিয়ে তিনি বলেন, জামায়াত কারও কাছ থেকে চাঁদা নেবে না, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কে জয়যুক্ত করবে।

সভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে। ট্যাক্সের বাইরে কিন্তু একটা বেসরকারি ট্যাক্স আছে। প্রত্যেকটা মুদির দোকানে, রাস্তাঘাটে, হকারের কাছে, এমনকি রাস্তার পাশে বসে যে ভাই-বোনটি ভিক্ষা করে, তার কাছ থেকেও একটি ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্সের টাকা আমরা আমাদের জনগণের হাতে তুলে দিতে চাই না। না, শুধু তাই না, ওই ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হবে। ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সমালোচনা জামায়াত আমির বলেন, আমরা ওই ধরনের কোনও কার্ডের ওয়াদা দিচ্ছি না। দুই হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনও কিছু সমাধান হবে না।

জনসভায় মঞ্চে থাকা জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন দলটির আমির। এ সময় তিনি পঞ্চগড়-১ আসনে জোটের প্রার্থী এনসিপির সারজিস আলম ও পঞ্চগড়-২ আসনের জোটের প্রার্থী জামায়াতের সফিউল আলম সুফিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।

ভোট ডাকাতদের কারণে বিগত ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি এবং দেশের মানুষ নতুন কোনও ভোট ডাকাত দেখতে চায় না উল্লেখ করে জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, আর এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে আমাদের সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদের একই পরিণতি হবে।

জামায়াত আমির বলেন, যারা নিজেদের দলের লোকদের চাঁদাবাজি, দখল–বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়িচাপা দিয়ে লোক হত্যা থেকে বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। যারা এগুলো পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই দেখাক, জাতি তাদের মতলব বুঝতে পারবে।

অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ করে শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের যে কষ্ট সবাই মিলে ভোগ করতে হয়েছে, সেই কষ্ট যেন এসব দল জনগণকে না দেয়। তবে অনেকে দিচ্ছে, সেটি যেন বন্ধ হয়। আর বন্ধ না হলে ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ দুটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে আর অনেকগুলো ‘না’ ভোট দেবে।

এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ একটা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়, ঘুণে ধরা রাজনীতির কাঠামো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়। জনগণ মুখিয়ে আছে, এ জন্য জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলবে। জনগণ আরেকটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, ১০ দলীয় সমঝোতার জোটকে বিজয়ী করার মানে আধিপত্যবাদ, চাঁদাবাজ, দখলদার, ফ্যাসিবাদ, ব্যাংক ডাকাত, মা-বোনদের ইজ্জতের ওপরে যারা হাত দেয়, তাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট যুবকদের দক্ষ করে তোলা হবে। তাদের হাতে খয়রাতি অনুদান তুলে দিয়ে অপমান করা হবে না।

জামায়াত আমির ঘোষণা করেন, ‘চাঁদা আমরা নেব না এবং চাঁদা কাউকে নিতে দেব না। আমরা বলেছি, দুর্নীতি আমরা করব না এবং দুর্নীতি কাউকে করতেও দেব না। আমরা বলেছি, ইনসাফ প্রত্যেকের জন্য জাতি, ধর্ম, দল–নির্বিশেষে নিশ্চিত করা হবে। ইনসাফ এখন থেকে আর টাকার মূল্যে বিক্রি হবে না।

ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার। এমন বাংলাদেশ গড়তে ১০ দলের প্রতীকের পক্ষে সর্বশক্তি নিয়োগ করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং প্রতীকে ‘হ্যাঁ’ দিতে হবে।

জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত নারীদের সম্মানের জায়গায় রাখতে চায়। কর্মক্ষেত্রে তারা সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তাদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। রাস্তাঘাটে তাদের চলাফেরায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করছে জামায়াত। তার জন্য যা করার দরকার, ক্ষমতায় যেতে পারলে সব করা হবে। যারা এর বাইরে আজেবাজে কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, মা-ভাইয়েরা তাদের জবাব দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির আরও বলেন, আমরা কিছু বন্ধুকে বলতে চাই, মেহেরবানি করে মা–বোনদের ইজ্জত নিয়ে কখনো টান দেবেন না। তাহলে আগুন জ্বলবে কিন্তু। সব সহ্য করব, মা–বোনদের ইজ্জতের ব্যাপারে বরদাশত করব না।

শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে স্মরণ করে শফিকুর রহমান বলেন, তার কণ্ঠ ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে। যারা তা চায় না, তারাই তাকে শেষ করে দিয়েছে। হাদি হারিয়ে যায়নি। সে ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান উন্নয়নের প্রচলিত ধারা পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এতদিন উন্নয়ন টেকনাফ থেকে শুরু হয়ে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো না। এখন থেকে উন্নয়ন হবে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ অভিমুখে, যাতে সারা দেশে উন্নয়নের একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। এই লক্ষে নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে শক্তিশালী করার গুরুত্বারোপ করেন।

উত্তরবঙ্গের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর করুণ দশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নদীগুলো আজ মরে কঙ্কাল হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। তিনি নদীগুলোকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ১০ দলীয় জোট সরকার গঠন করতে পারলে শুধু নদীর জীবনই নয়, মানুষের জীবনেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।

জামায়াত আমির বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য মানুষকে যেন আর রাজধানীমুখী হয়ে রাস্তায় প্রাণ হারাতে না হয়, সেজন্য দেশের ৬৪টি জেলাতেই মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে। এই পঞ্চগড়েও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য মেডিকেল কলেজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তিনি আর বলেন, চারটি বিশাল নদী আল্লাহ তায়ালা উত্তরবঙ্গকে দান করেছিলেন। এগুলো হলো তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র এবং করতোয়া। এখন দেখা যায় এগুলো যেন নদী নয়, যেন মরুভূমি। মরা কংকাল হয়ে আছে নদীগুলো। আজকে আমাদের আল্লাহর দান এ নিয়ামত নদীগুলোকে গুম করা হয়েছে। এই দেশের কি কোন মা-বাপ ছিল না? তাহলে আমার নদী মরে গেল কেন? ওরা জনগনের প্রতি পাঁচ বছরে একবার দরদের হাড়িতে জ্বাল দেয় আর তা উতলাইয়া উঠে। বাকী সাড়ে চার বছর তাদের আর হারিকেন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ আবার বসন্তের কোকিল, বসন্ত আসলে তারা এসে বলে কুহু কুহু। এরপর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা অবিচার, দূর্নীতি, চাঁদাবাজী, দখলদারী, স্বৈরাচারকে বিদায় দিয়ে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক আধিপত্যবাদমুক্ত, দূর্নীতিমুক্ত, দুঃশাসনমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। আমরা থামবো না, কেউ থামাতে পারবে না।

জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, এনপিপির উত্তরাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক ও পঞ্চগড়-১ আসনের ১০ দলীয় জোট মনোনিত প্রর্থী সারজিস আলম, পঞ্চগড়-২ আসনের জামায়াত মনোনিত প্রার্থী সফিউল আলম।

জনসভায় বক্তব্য দেন জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এনপিপির জেলা আহবায়ক অ্যাডভোকেট জুলফিকার আলম নয়নসহ ১০ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ।

 

 

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ভাঙ্গার চৌকিঘাটায় ব্রিজ যেন ‘মরণফাঁদ’

উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ‘সৎ মায়ের’ মতো আচরণ করা হয়েছে : জামায়াত আমির

প্রকাশের সময় : ০৫:২৯:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি : 

দেশের খাদ্য যোগানে উত্তরবঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রাখলেও এ অঞ্চলকে ‘ইচ্ছে করে’ বঞ্চিত রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে উত্তরবঙ্গ গরিব নয়, গরিব করে রাখা হয়েছে; সেই বঞ্চনার সাক্ষী হতে এসেছি। সৎ মায়ের মতো উত্তরবঙ্গের সাথে আচরণ করা হয়েছে। এই উত্তরবঙ্গ আমাদের কলিজার অংশ, এই উত্তরবঙ্গ দেশকে খাদ্য এবং পুষ্টি সরবরাহ করে। আর সেই উত্তরবঙ্গকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে ইচ্ছা করে।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) ১০ দলীয় জোটের ঢাকার বাইরে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিনের প্রথম কর্মসূচিতে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠের জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গকে আগামীতে আমরা আর কাউকে পিছিয়ে রাখতে চাই না। আপনাদের সকলের হাতে মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে চাই। আমাদের প্রত্যেকটা যুবক-যুবতী, প্রত্যেকটা নাগরিককে আমরা দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে তৈরি করতে চাই। গোটা উত্তরবঙ্গকে আমরা কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী বানাতে চাই। বন্ধ চিনি কলগুলো খুলে দিতে চাই, শ্রমিকদেরকে কর্ম ফিরিয়ে দিতে চাই।

জামায়াত আমির বলেন, ভাই আমাদের কাছে কোনো কার্ড নাই। আপনারা সবাই ভাই-বোনেরা আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে আমরা একটা ভালোবাসার কার্ড গুঁজে দিতে চাই। আপনাদের সেই ভালোবাসা দিয়ে আমরা একটা বঞ্চনা, অবিচার এবং দায়-দেনা মুক্ত একটা বাংলাদেশ গড়তে চাই। কারো দয়ার পাত্র হয়ে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বসবাস করবে, তা আমরা দেখতে চাই না। কে কার উপর দয়া করবে? জনগণের ট্যাক্সের পয়সা নিয়ে পরের ধনে পোদ্দারি এ আমরা করব না।

শফিকুর রহমান বলেন, মানুষ বলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। ওই টেকনাফের উন্নয়ন জোয়ার আর আসতে পারে না তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। আমরা এবার বলব তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ। এতদিন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছিল, এখন ব্যালেন্স হওয়া দরকার—তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ।

জামায়াত আমির বলেন, দেশে ইনসাফ থাকলে দুর্নীতি ও টাকার পাচার হতো না। আওয়ামী শাসনামলে আয়নাঘর তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হয়েও রেহাই পায়নি অনেকে।

জনগণ এবার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কে জয়যুক্ত করতে মুখিয়ে আছে জোর দিয়ে তিনি বলেন, জামায়াত কারও কাছ থেকে চাঁদা নেবে না, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কে জয়যুক্ত করবে।

সভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে। ট্যাক্সের বাইরে কিন্তু একটা বেসরকারি ট্যাক্স আছে। প্রত্যেকটা মুদির দোকানে, রাস্তাঘাটে, হকারের কাছে, এমনকি রাস্তার পাশে বসে যে ভাই-বোনটি ভিক্ষা করে, তার কাছ থেকেও একটি ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্সের টাকা আমরা আমাদের জনগণের হাতে তুলে দিতে চাই না। না, শুধু তাই না, ওই ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হবে। ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সমালোচনা জামায়াত আমির বলেন, আমরা ওই ধরনের কোনও কার্ডের ওয়াদা দিচ্ছি না। দুই হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনও কিছু সমাধান হবে না।

জনসভায় মঞ্চে থাকা জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন দলটির আমির। এ সময় তিনি পঞ্চগড়-১ আসনে জোটের প্রার্থী এনসিপির সারজিস আলম ও পঞ্চগড়-২ আসনের জোটের প্রার্থী জামায়াতের সফিউল আলম সুফিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।

ভোট ডাকাতদের কারণে বিগত ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি এবং দেশের মানুষ নতুন কোনও ভোট ডাকাত দেখতে চায় না উল্লেখ করে জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, আর এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে আমাদের সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদের একই পরিণতি হবে।

জামায়াত আমির বলেন, যারা নিজেদের দলের লোকদের চাঁদাবাজি, দখল–বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়িচাপা দিয়ে লোক হত্যা থেকে বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। যারা এগুলো পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই দেখাক, জাতি তাদের মতলব বুঝতে পারবে।

অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ করে শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের যে কষ্ট সবাই মিলে ভোগ করতে হয়েছে, সেই কষ্ট যেন এসব দল জনগণকে না দেয়। তবে অনেকে দিচ্ছে, সেটি যেন বন্ধ হয়। আর বন্ধ না হলে ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ দুটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে আর অনেকগুলো ‘না’ ভোট দেবে।

এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ একটা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়, ঘুণে ধরা রাজনীতির কাঠামো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়। জনগণ মুখিয়ে আছে, এ জন্য জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলবে। জনগণ আরেকটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, ১০ দলীয় সমঝোতার জোটকে বিজয়ী করার মানে আধিপত্যবাদ, চাঁদাবাজ, দখলদার, ফ্যাসিবাদ, ব্যাংক ডাকাত, মা-বোনদের ইজ্জতের ওপরে যারা হাত দেয়, তাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট যুবকদের দক্ষ করে তোলা হবে। তাদের হাতে খয়রাতি অনুদান তুলে দিয়ে অপমান করা হবে না।

জামায়াত আমির ঘোষণা করেন, ‘চাঁদা আমরা নেব না এবং চাঁদা কাউকে নিতে দেব না। আমরা বলেছি, দুর্নীতি আমরা করব না এবং দুর্নীতি কাউকে করতেও দেব না। আমরা বলেছি, ইনসাফ প্রত্যেকের জন্য জাতি, ধর্ম, দল–নির্বিশেষে নিশ্চিত করা হবে। ইনসাফ এখন থেকে আর টাকার মূল্যে বিক্রি হবে না।

ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার। এমন বাংলাদেশ গড়তে ১০ দলের প্রতীকের পক্ষে সর্বশক্তি নিয়োগ করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং প্রতীকে ‘হ্যাঁ’ দিতে হবে।

জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত নারীদের সম্মানের জায়গায় রাখতে চায়। কর্মক্ষেত্রে তারা সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তাদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। রাস্তাঘাটে তাদের চলাফেরায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করছে জামায়াত। তার জন্য যা করার দরকার, ক্ষমতায় যেতে পারলে সব করা হবে। যারা এর বাইরে আজেবাজে কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, মা-ভাইয়েরা তাদের জবাব দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির আরও বলেন, আমরা কিছু বন্ধুকে বলতে চাই, মেহেরবানি করে মা–বোনদের ইজ্জত নিয়ে কখনো টান দেবেন না। তাহলে আগুন জ্বলবে কিন্তু। সব সহ্য করব, মা–বোনদের ইজ্জতের ব্যাপারে বরদাশত করব না।

শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে স্মরণ করে শফিকুর রহমান বলেন, তার কণ্ঠ ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে। যারা তা চায় না, তারাই তাকে শেষ করে দিয়েছে। হাদি হারিয়ে যায়নি। সে ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান উন্নয়নের প্রচলিত ধারা পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এতদিন উন্নয়ন টেকনাফ থেকে শুরু হয়ে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো না। এখন থেকে উন্নয়ন হবে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ অভিমুখে, যাতে সারা দেশে উন্নয়নের একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। এই লক্ষে নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে শক্তিশালী করার গুরুত্বারোপ করেন।

উত্তরবঙ্গের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর করুণ দশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নদীগুলো আজ মরে কঙ্কাল হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। তিনি নদীগুলোকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ১০ দলীয় জোট সরকার গঠন করতে পারলে শুধু নদীর জীবনই নয়, মানুষের জীবনেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।

জামায়াত আমির বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য মানুষকে যেন আর রাজধানীমুখী হয়ে রাস্তায় প্রাণ হারাতে না হয়, সেজন্য দেশের ৬৪টি জেলাতেই মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে। এই পঞ্চগড়েও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য মেডিকেল কলেজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তিনি আর বলেন, চারটি বিশাল নদী আল্লাহ তায়ালা উত্তরবঙ্গকে দান করেছিলেন। এগুলো হলো তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র এবং করতোয়া। এখন দেখা যায় এগুলো যেন নদী নয়, যেন মরুভূমি। মরা কংকাল হয়ে আছে নদীগুলো। আজকে আমাদের আল্লাহর দান এ নিয়ামত নদীগুলোকে গুম করা হয়েছে। এই দেশের কি কোন মা-বাপ ছিল না? তাহলে আমার নদী মরে গেল কেন? ওরা জনগনের প্রতি পাঁচ বছরে একবার দরদের হাড়িতে জ্বাল দেয় আর তা উতলাইয়া উঠে। বাকী সাড়ে চার বছর তাদের আর হারিকেন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ আবার বসন্তের কোকিল, বসন্ত আসলে তারা এসে বলে কুহু কুহু। এরপর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা অবিচার, দূর্নীতি, চাঁদাবাজী, দখলদারী, স্বৈরাচারকে বিদায় দিয়ে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক আধিপত্যবাদমুক্ত, দূর্নীতিমুক্ত, দুঃশাসনমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। আমরা থামবো না, কেউ থামাতে পারবে না।

জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, এনপিপির উত্তরাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক ও পঞ্চগড়-১ আসনের ১০ দলীয় জোট মনোনিত প্রর্থী সারজিস আলম, পঞ্চগড়-২ আসনের জামায়াত মনোনিত প্রার্থী সফিউল আলম।

জনসভায় বক্তব্য দেন জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এনপিপির জেলা আহবায়ক অ্যাডভোকেট জুলফিকার আলম নয়নসহ ১০ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ।