স্পোর্টস ডেস্ক :
ইডেন গার্ডেন্সে যা ঘটল, তাকে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা তাণ্ডব বললেও হয়তো কম বলা হবে। গ্রুপ পর্ব আর সুপার-৮ এ টানা সাত ম্যাচ অপরাজিত থাকা দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করল কিউই ওপেনাররা। ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রোটিয়া বোলারদের পাড়ার স্তরে নামিয়ে আনলেন টিম সেইফার্ট ও ফিন অ্যালেন।
বিশেষ করে ফিন অ্যালেন ছিলেন খুনে মেজাজে। সেমিফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচে মাত্র ৩৩ বলে অপরাজিত সেঞ্চুরির এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। তার এই অতিমানবীয় তাণ্ডবে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে আফ্রিকা, আর তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের ফেরার ‘রিটার্ন টিকিট’। ড্যাশিং এই ওপেনারের ব্যাটে চড়ে রাজকীয়ভাবে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে নিউজিল্যান্ড।
বুধবার (৪ মার্চ) কলকাতার ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্সে টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৬৯ রান সংগ্রহ করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রোটিয়াদের পক্ষে একাই লড়াই চালিয়ে সর্বোচ্চ অপরাজিত ৫৫ রান করেন মার্কো জানসেন। তবে লড়াই করার মতো এই পুঁজি যে ফিন অ্যালেনের ঝড়ের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি এইডেন মার্করামের দল। ১৭০ রানের চ্যালেঞ্জ নিউজিল্যান্ড টপকে যায় মাত্র ১২ ওভার ৫ বলে, হাতে তখনও ছিল ৯টি উইকেট।
নেট রান রেটের ব্যবধানে পাকিস্তানকে টপকে সেমিফাইনালে পা রাখা নিউজিল্যান্ড এখন রয়েছে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার সন্ধানে। আগামী রোববার আহমেদাবাদে অনুষ্ঠেয় ফাইনালে তারা ভারত অথবা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে।
গত আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। এবার গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তারা হেরেছিল বড় ব্যবধানে। সেমি-ফাইনালে উঠতে তাদের নির্ভর করতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান ম্যাচের ওপর। সেই দলই এখন শিরোপা থেকে আর একটি জয় দূরে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এই প্রথম জয়ের স্বাদ পেল নিউজিল্যান্ড। দুই দলের আগের পাঁচ ম্যাচের সবকটি জিতেছিল প্রোটিয়ারা।
বিধ্বংসী সেঞ্চুরিতে নিউজিল্যান্ডের নায়ক অ্যালেন। স্রেফ ৩৩ বলে সেঞ্চুরি করে ম্যাচ শেষ করেন তিনি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম সেঞ্চুরি এটি, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে যৌথভাবে তৃতীয় দ্রুততম। আট ছক্কা ও ১০ চারে গড়া অপরাজিত ১০৩ রানের ইনিংসে ম্যাচ-সেরার স্বীকৃতি পান তিনিই।
অ্যালেনের সঙ্গে ১১৭ রানের বিস্ফোরক উদ্বোধনী জুটি গড়ার পথে ৩৩ বলে ৫৮ রান করেন টিম সাইফার্ট।
টস জিতে অনুমিতভাবে বোলিং নেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক স্যান্টনার। দ্বিতীয় ওভারে তিনি নতুন বল তুলে দেন অফ স্পিনিং অলরাউন্ডার কোল ম্যাককনকির হাতে। পরপর দুই বলে কুইন্টন ডি কক ও রায়ান রিকেলটনকে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগান নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ১৮তম সদস্য ম্যাককনকি।
হ্যাটট্রিক ডেলিভারিতে চার মেরে শুরু করেন ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। ৩ রানে এইডেন মার্করামের ক্যাচ ফেলেন রাচিন রাভিন্দ্রা। সেই রাভিন্দ্রাই পরে নিজের পরপর দুই ওভারে ফিরিয়ে দেন মার্করাম (২০ বলে ১৮) ও ডেভিড মিলারকে। একবার জীবন পেয়েও ৬ রানে থামেন মিলার।
পরের ওভারে ব্রেভিসকে (২৭ বলে ৩৪) থামান জেমস নিশাম। তখন ৭৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপদে দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখান থেকে ইনিংস সর্বোচ্চ ৭৩ রানের জুটিতে দলের স্কোর দেড়শতে নিয়ে যান ট্রিস্টান স্টাবস ও ইয়ানসেন।
দুই চার ও এক ছক্কায় ২৪ বলে ২৯ রান করে শেষের আগের ওভারে ফেরেন স্টাবস। ওই ওভারে লকি ফার্গুসনকে পরপর দুই ছক্কায় ইয়ানসেন ফিফটি পূর্ণ করেন ২৭ বলে।
শেষ ওভারে স্রেফ ৬ রান দিয়ে কর্বিন বশ ও কাগিসো রাবাদার উইকেট নেন ম্যাট হেনরি, যার এই ম্যাচে খেলা নিয়েই ছিল অনিশ্চতা। সন্তান জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে ছুটিতে দেশে ছুটে গিয়ে আগের রাতে ভারতে ফেরেন এই ফাস্ট বোলার। পাঁচ ছক্কা ও দুই চারে ৩০ বলে ৫৫ রানে অপরাজিত রয়ে যান ইয়ানসেন।
রান তাড়ায় অ্যালেন ও সাইফার্টের ব্যাটে উড়ন্ত শুরু পায় নিউজিল্যান্ড। সাইফার্ট যদিও একটি সুযোগ দিয়েছিলেন দ্বিতীয় ওভারে বল আকাশে তুলে। কিন্তু কিপার ডি কক ও ব্রেভিসের ভুল বোঝাবুঝিতে বলের নিচেই যেতে পারেননি কেউ।
দুই ওপেনারের তাণ্ডবে প্রথম ছয় ওভারে নিউজিল্যান্ড করে বিনা উইকেটে ৮৪। বিশ্বকাপে পাওয়ার প্লেতে এটি নিউ জিল্যান্ডের সর্বোচ্চ, নকআউট ম্যাচে যেকোনো দলের সর্বোচ্চ। ২০১৬ আসরের সেমি-ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের বিনা উইকেটে ৬৭ ছিল আগের সর্বোচ্চ।
সাইফার্ট ফিফটি করেন ২৮ বলে। পঞ্চাশ ছুঁতে অ্যালেনের লাগে ১৯ বল। দশম ওভারে সাইফার্টকে বোল্ড করে বড় জুটি ভাঙেন রাবাদা। এই বিশ্বকাপে সাইফার্ট ও অ্যালেনের জুটিতে এলো মোট ৪৬৩ রান, বিশ্বকাপের এক আসরে যা কোনো জুটির রেকর্ড। টি-টোয়েন্টিতে যেকোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্টেও সর্বোচ্চ।
১২ ওভার শেষে অ্যালেনের রান ছিল ৭৬। জয়ের জন্য নিউজিল্যান্ডের দরকার তখন ২১। ত্রয়োদশ ওভারে ইয়ানসেনের প্রথম দুই বলে চার ও পরের দুই বলে ছক্কা মেরে ৯৬ রানে পৌঁছে যান অ্যালেন। পরের বলে চার মেরে তার সেঞ্চুরি ও দলের জয়।
২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে কেন উইলিয়ামসনের নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ড হেরেছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।
স্পোর্টস ডেস্ক 
























