সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ০৭:০০ পূর্বাহ্ন

সোনা-হীরার মাধ্যমে বছরে ৯১ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে : বাজুস

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : সোমবার, ৩ জুন, ২০২৪
সোনা-হীরার মাধ্যমে বছরে ৯১ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে : বাজুস

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

সোনা ও হীরা চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরে ৯১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি বা বাজুস। পুরো এই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে চোরাকারবারিরা বিদেশে পাচার করে থাকে বলে জানায় বাজুস।

সোমবার (৩ জুন) বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের বাজুস কার্যালয়ে সারা দেশে জুয়েলারি শিল্পের চলমান সংকট ও দেশি-বিদেশি চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, অর্থপাচার ও চোরাচালান বন্ধ এবং কাস্টমসসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জোরালো অভিযানের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাজুসের উপদেষ্টা রুহুল আমিন রাসেল, বাজুস কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি ও বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এন্টি-স্মাগলিং অ্যান্ড ল এনফোর্সমেন্টের চেয়ারম্যান মো. রিপনুল হাসান, সহ-সভাপতি মাসুদুর রহমান, কার্যানির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রিপনুল হাসান বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০টি জেলার সীমান্ত অবস্থিত। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের ৬ জেলা মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াড়াঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরা সোনা চোরাচালানের নিরাপদ রুট হয়ে উঠেছে। ভারতে পাচার হওয়া সোনার বড় একটি অংশ এসব জেলার সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে থাকে। বাজুসের প্রাথমিক ধারণা- প্রবাসী শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার করে প্রতিদিন সারা দেশের জল, স্থল ও আকাশ পথে কমপক্ষে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার অবৈধ সোনার অলংকার, সোনার বার, ব্যবহৃত পুরোনো জুয়েলারি ও হীরার অলংকার চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসছে, বছর শেষে যা দাঁড়ায় প্রায় ৯১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বা তার চেয়ে বেশি।
এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ২২০ কোটি টাকার সোনা ও সোনার অলংকার এবং ৩০ কোটি টাকার হীরা ও হীরার অলংকার আসে। সে হিসাবে বছরে ৮০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার সোনা ও ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার হীরা অবৈধভাবে আসছে। এ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে সোনা ও হীরা চোরাকারবারিরা বিদেশে পাচার করে থাকে। যার ফলে সরকার রেমিট্যান্স হারাচ্ছে। চলমান ডলার সংকটে এ বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার ও চোরাচালান বন্ধে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানায় বাজুস।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়কালে সোনা যদি আনুষ্ঠানিক পথে আমদানি করা হতো তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকে ২২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ জমা হতো, যা থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণ হতো প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

এপিবিএনের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এপিবিএন বিগত কয়েক বছরে ১৩১ দশমিক ১১০ কেজি সোনার বার, অলংকার জব্দ করেছে। যার বর্তমান বাজারদর ১৩০ কোটি ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

ঢাকা কাস্টমস হাউসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমেই ২০২০ সালে ২ দশমিক ৭৭৫ টন, ২০২১ সালে ২৫ দশমিক ৬৮৯ টন, ২০২২ সালে ৩৫ দশমিক ৭৩৩ টন ও ২০২৩ সালে ৩১ দশমিক ৪৬৮ টন সোনার বার ব্যাগেজ রুলের আওতায় আমদানি হয়েছে।

কাস্টমসের তথ্য মতে, ২০২০ থেকে ২০২২ সালে শিল্পে ব্যবহারের জন্য ৪টি চালানে ২ কেজি ১৬০ গ্রাম ডায়মন্ড আমদানি করা হয়েছে। তবে কোনো হীরার অলংকার আমদানি হয়নি। গত ১৯ বছরে যত হীরা আমদানি হয়েছে তার ৮৭ শতাংশই আনা হয়েছে ভারত থেকে। ভারতের গুজরাটের সুরাটে বিশ্বের ৬৫ শতাংশের বেশি হীরা কাটিং ও পলিশিং করা হয়। খুব সহজে বহন করা যায় বলে দেশটি থেকে অবৈধভাবে হীরা আসছে বলে অনেকের ধারণা।

এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা ভারত থেকে বাংলাদেশে পাচারের সময় বিগত কয়েক বছরে কয়েকটি চালান জব্দ করেছে। ২০২১ সালে সাতক্ষীরা সীমান্তে পৌনে ২ কোটি টাকার ১৪৪টি হীরার গয়না জব্দ করেছে বিজিবি। ২০১৮ সালে ৭০ লাখ টাকার হীরার গয়না জব্দ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অবৈধ পথে হীরা আমদানির বড় কারণ কর ফাঁকি। হীরা আমদানিতে কর অনেক বেশি। যেমন বন্ড সুবিধা ছাড়া অমসৃণ হীরা আমদানিতে কর ৮৯ শতাংশ। মসৃণ হীরা আমদানিতে কর প্রায় ১৫১ শতাংশ। এ কর ফাঁকি দিতেই মূলত অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণে হীরা আসছে। গত ১৯ বছরে এ মূল্যবান রত্ন আমদানিতে সরকার মাত্র ১২ কোটি টাকার রাজস্ব পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে- দেশে হীরার বাজার প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। এ হীরার বাজার পুরোটাই চোরাচালান নির্ভর হয়ে আছে। সোনা চোরাচালানের খবর পাওয়া গেলেও আমরা হীরা চোরাচালানের খবর না পাওয়া রহস্যজনক। হীরা চোরাচালানের সঙ্গে কারা জড়িত তাও দ্রুত চিহ্নিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছে বাজুস।

বাজুস মনে করে, সারা দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা রক্ষা ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও ব্যবসায়িক সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো দুষ্কৃতকারী, চোরাকারবারি যাতে দেশবিরোধী ও অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে সে লক্ষ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে আসছে। অনেক চোরাকারবারিকে আইনের মুখোমুখি করা হয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ছে। অবৈধ উপায়ে কোনো চোরাকারবারি যেন হীরা ও সোনা অলংকার দেশে আনতে এবং বিদেশে পাচার করতে না পারে সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আবহাওয়া