শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:২১ অপরাহ্ন

মানব পাচার করে কোটিপতি জামাল-কামাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

এ যেনো সিনেমার গল্প। ২০০৮ সালে ছিলেন দর্জি দোকানের সহযোগী। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ধারদেনা করে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রবাসে। সেখানেও ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেননি তিনি। তাতে কি! দেশে ফিরে শুরু করেন মানব পাচার। রাতারাতি হয়ে যান কোটিপতি। তিনি ফেনীর দাগনভূঞার জামাল হোসেন। বিদেশ থেকে দেশে ফিরে ভাই কামাল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন মানব পাচারসহ নানা জালিয়াতি।

জামাল হোসেন প্রবাস থেকে দেশে ফিরে নিজের এলাকায় রাজনীতি শুরু করেন। কিন্তু এলাকায় রাজনীতি করেও বেশিদিন টিকে থাকতে পারেননি। এলাকায় মানুষের কাছে নিজের অপকর্মের কারণে বিতাড়িত হয়ে চলে আসেন ঢাকায়। রাজধানীতে এসে বড় ভাইয়ের কর্মস্থল গোমতি ট্রাভেলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। তার বড়ভাই কামাল এই প্রতিষ্ঠানের পিয়ন হিসেবে কাজ করতেন।

ওই ট্রাভেলসে চাকরি করার সুবাধে ডিএমও অফিসে দুই ভাইকে ডাটা তৈরির জন্য পাঠানো হতো। সেখান থেকেই শুরু হয় তাদের প্রতারণার ফাঁদ। দুই ভাই ডাটা তৈরি করতে গিয়ে শুরু করে ডাটা তৈরিতে ব্যবহৃত পে-অর্ডার জালিয়াতি। কিন্তু কয়েকদিন পর যখন ডাটা প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে যান দুই ভাই। এরপর শুরু হয় তাদের নতুন ফন্দি। জনশক্তি অফিসে শুরু করেন দালালি।

অভিযোগ রয়েছে, যেখানে বৈধ ভিসায় পাসপোর্টের বিপরীত বহিগর্মন ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হলে ২ দিন পর এডি-ডিডি, এডিজি, ডিজির স্বাক্ষর পেয়ে অনুমোদন পেত, সেখানে তারা একাই এক ঘণ্টায় এসব স্বাক্ষর ম্যানেজ করে দিতেন। বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিল জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো।

সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির যুগ্মসচিব মোহাম্মদ আতাউর রহমান পরিচালকের বরাবর একটি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করে চিঠিও দেন। সেখানে তিনি বলেন, রি-এজেন্সি মেসার্স এনআর ইন্টারন্যাশনাল প্রতিনিধি জামাল হোসেন কর্তৃক অবৈধ ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পে-অর্ডার এন্ট্রিসহ ৭৪ জন কর্মী বহির্গমন ছাড়পত্র নেয়ার অপচেষ্টার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত।

শুধু তাই নয়, তিনি সুপারিশ করে বলেন, সংঘটিত ঘটনার দায় এড়ানোর সুযোগ না থাকায় এবং অন্য একটি রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স জেকে ওভারসিজের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্র অভিবাসী আইন-২০১৩ এর পরিপন্থি হওয়ায় তারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেয়ার অনুরোধ করেন।

পরে বিএমইটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক মো. রেজওয়ানুল হক চৌধুরী বিষয়টি তদন্ত করে এর প্রমাণও পেয়েছিলেন। এরপরও তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বিএমটিইর কারো কাছ থেকে এর উত্তর পাওয়া যায়নি। এই যাত্রায় তারা বেঁচে গেলেও গত কয়েকদিন আগে মানবপাচারের অভিযোগে দুই ভাইকে আটক করে র‌্যাব-৩।

জানা গেছে, আগে অন্যান্য জালিয়াতি করলেও চার বছর ধরে মানবপাচার করে আসছিলেন দুই ভাই কামাল হোসেন ও জামাল হোসেন। ভিয়েতনামে লোক পাঠিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন দুই ভাই। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। ভিয়েতনামে মানবপাচারের মামলায় গ্রেপ্তার দুই সহোদরসহ তিনজনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন ঢাকার আদালত। গত ১৪ই জুলাই ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত কারাগারে পাঠানোর এই আদেশ দেন।

এর আগে পল্টন এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই ভাইসহ তিনজনকে আটক করে র‌্যাব। র‌্যাব-৩ তাদের পল্টন থানায় সোপর্দ করে এবং তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা করেন র‌্যাবের এক কর্মকর্তা। তারা অবৈধভাবে ৩৮ জনকে ভিয়েতনামে পাঠিয়েছিলেন প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে- হাজারের অধিক মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন তারা। ওই ৩৮ জন থেকে ১১ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

ঢাকার আদালতকে পুলিশ প্রতিবেদন দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের এক শ্রেণির অসাধু দালালচক্র স্বল্প আয়ের মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যদের যোগসাজশে বিদেশে পাচার করে আসছে। সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের প্রতারণার শিকার হয়ে নিরীহ মানুষ ভিয়েতনামসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এ ছাড়া অবৈধভাবে বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

ভিয়েতনামে নির্যাতনের শিকার আপেল শিকদার ও জহির আহম্মেদকে ফেনীর আবদুল্লাহ আল মামুন ও মহিউদ্দিন ভিয়েতনামে বেশি টাকা বেতন দেয়ার প্রলোভন দেখান। দু’জনই প্রলোভনে পা দিয়ে প্রত্যেকে ৩ লাখ ২০ হাজার করে টাকা দিয়ে ভিয়েতনাম যাওয়ার জন্য চুক্তি করেন। দুই ভাই জামাল-কামালের প্রতিষ্ঠান ‘দ্য জেকে ওভারসিজ লিমিটেড’ অফিসে তারা ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেন। পরে ওই বছরের ১৭ই নভেম্বর কামাল ও জামালের কাছে আরো ২ লাখ টাকা দেন ভুক্তভোগীরা। পরে আবদুল্লাহ আল মামুন ও মহিউদ্দিন গত বছরের ১৮ই নভেম্বর কলকাতা হয়ে ভিয়েতনামে যান।
ভিয়েতনামে যাওয়ার পর সেখানে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য গোলাম আজম ও জাফর তাদের নিয়ে সেখানকার হো চি মিন সিটির একটি বাসায় নিয়ে যায়।

সেখানে তাদের কিছুদিন রাখার পর একটি ‘স’ মিলে মাসিক ২০০ ডলারে কাজ দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর তাদের ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে কোনো কাজ না পেয়ে হোটেলে চার মাস ধরে মানবেতর জীবনযাপন করেন। পরে তারা ভিয়েতনামে বাংলাদেশি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

গত ৩রা জুলাই বাংলাদেশে ফিরে আসেন। মানবপাচারের শিকার হয়ে একইভাবে ভিয়েতনাম থেকে প্রাণেশ কুমার মাহাতো, মাহমুদুল হাসান, এনামুল হক, তোফায়েল আহম্মেদ, শরিফুল ইসলাম, কামাল উদ্দিন ও আনাস বাংলাদেশে ফিরে আসেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাহ আলম বলেন, দীর্ঘদিন থেকে এই মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা নিরীহ মানুষকে বেশি বেতন দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে আসছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মানবপাচার করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হন দুই ভাই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানবপাচার ও জালিয়াতি করে উপার্জিত টাকা দিয়ে ফেনীর দাগনভূঞা বাজারে সমপ্রতি ১৫ শতাংশ জায়গায় মার্কেট নির্মাণ করেছেন দুই ভাই। শাহজানপুরে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন একটি বাড়ি।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম রোডে পাঁচটি মালবাহী কন্টেনার গাড়ি, খিলগাঁও বাসাবো গুলিস্তান রোডে অর্ধশতাধিক লেগুনা রয়েছে শতাধিক রিকশা। ফেনীর কাজীরবাগে বাড়িসহ কিনেছেন কয়েক বিঘা জমি। নামে-বেনামে কয়েক জায়গা জমি লিজ নিয়েছেন। হক সোসাইটিতে রয়েছে আলিশান বাড়ি। রয়েছে নামে-বেনামে ব্যাংক হিসেবে।

 

এসব বিষয়ে ফেনীর দাগনভূঞার রাজাবাজারের একজন দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জামাল-কামাল দুই ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। একটি দর্জি দোকানে কাজ করতো জামাল। পরে কীভাবে এতো টাকার মালিক হলো, তা জানা নেই। তাও অল্প কয়েকদিনে। কয়েক বছর আগেও ধারদেনা করে জামাল বিদেশ গিয়েছিল। তবে কয়েক বছর ধরে তারা বিদেশে লোক পাঠাতো শুনতাম। এখন তারা প্রচুর টাকার মালিক। তাদের দিকে তাকানো যায় না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আবহাওয়া

%d bloggers like this:
%d bloggers like this: