বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:১৪ অপরাহ্ন

মসলার দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন!

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

ঈদুল আজহা এলেই মসলার দাম বাড়ে-এমনটাই হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। চলতি বছরের শুরু থেকেই মসলার বাজার ছিল চড়া। এমনকি ঈদুল ফিতরের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হয়েছে। ধারণ করা হচ্ছিল, কোরবানির ঈদ তথা ঈদুল আজহায় মসলার বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। তবে সে ধারণা এখন পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাজারের অবস্থা এমন, এখন চলতি বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে মসলা। শুধু তাই নয়, ঈদুল আজহার ঠিক আগের সময়ে গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই মসলার দাম সবচেয়ে কম!

শুক্রবার (২৪ জুলাই) কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, লকডাউনের সময় মসলাজাতীয় পণ্য অতিরিক্ত মজুত করায় বাজারে এখন এর সরবরাহ বেশি। ফলে দাম পড়ে গেছে। আবার কেউ বলছেন, বাজারে ক্রেতা কম থাকা ও সরবরাহ বেশি থাকায় এবার মসলা জাতীয় পণ্যের দাম এতটা কমে গেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে এবার বেচাকেনা নেই। মানুষের হাতেও টাকা নেই। অথচ বাজারে মসলার সরবরাহ বেশি। আর আন্তর্জাতিক বাজারেও মসলার দাম কমে গেছে। ফলে বাজারে এখন মসলাজাতীয় পণ্যের দাম অনেক কম রয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কারওয়ান বাজারের পাইকারি বাজারে বর্তমানে জিরা ২৭০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এ বছরেই সর্বোচ্চ ৪৮০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হয়ে জিরা। আবার এলাচের বর্তমান বাজারদর ২ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কেজি। অথচ ৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে ভালো মানের এলাচ বিক্রি হয়েছে মাস তিনেক আগেও।

একইভাবে সর্বোচ্চ ৮৮০ টাকা পর্যন্ত উঠে যাওয়া লবঙ্গের এখনকার দর ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি। অন্যদিকে বাজারের সবচেয়ে ভালো কিসমিসও বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা কেজিতে, যা ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। আর দারুচিনি ৩৬০ থেকে ৩৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, এর দাম ছিল সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা।

পাইকারি বিক্রেতা মের্সাস দেওয়ান এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী রাসেল মিয়া বলেন, মসলার বাজার এখন খুবই নিম্নমুখী। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই মসলার দাম সবচেয়ে কম। এ বছরের মতো কম দাম আর কখনো ছিল বলে মনে হয় না।

মসলাজাতীয় সব পণ্যের দামই কমেছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, কেজিতে জিরার দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কমেছে। এলাচের দাম কমেছে হাজার থেকে ১২শ টাকা। লবঙ্গের দাম কমেছে কেজিতে ২০০ টাকা। কিসমিসের দাম কমেছে কেজিতে ৩০ টাকা, দারচিনিতে ৩০ টাকা।

আরেক পাইকারি দোকান ফরিদগঞ্জ স্টোরের মালিক মো. মিজান বলেন, লকডাউনের সময় মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। পরে রোজার মধ্যে তা কমে এসেছে। রোজার ঈদেও দাম তুলনামূলক কম ছিল। আর কোরবানি ঈদের আগে তো একেবারেই কমে গেছে। দুই-চার-দশ বছরেও মসলাজাতীয় পণ্যের দাম এত কম কখনোই ছিল না।

খুচরা দোকানের মধ্যে কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের কর্মচারী আজগর বলেন, মসলার দাম অনেক কমছে। যখন দাম বেড়েছিল, তখন সবাই মজুত করেছিল। এখন সরবরাহ বেশি থাকায় দামও কমেছে।

খুচরা দোকানের এই বিক্রয়কর্মী জানান, বর্তমানে জিরা ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। ১৫ দিন আগেও এর দাম ছিল ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা, মাসখানেক আগে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি এলাচ ৩ হাজার থেকে ৪২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৫ দিন আগে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৪০০ টাকা এবং মাস খানেক আগে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে এই এলাচা।

এছাড়া বর্তমানে খুচরা বাজারে লবঙ্গ ৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে তা ৮৫০ টাকা ও মাসখানেক আগে আগে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। দুই সপ্তাহ আগে ৪০০ টাকা ও মাসখানেক আগে ৪৩০ টাকা ছিল দারচিনির দাম। এখন সেই দারচিনি বিক্রি হচ্ছে ৩৭০ টাকা কেজিতে। একইভাবে কিসমিসের দাম ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি। ১৫ দিন আগে তা ৩০০ থেকে ৩৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর কাঠবাদাম এখন ৬০০ টাকা কেজি, যা ১৫ দিন আগে ৬৫০ টাকা ও একমাস আগে ৭০০ টাকা ছিল।

আরেক দোকানী আলী স্টোরের কর্মচারী জাকির জানান, ঈদুল ফিতরের সময় জিরা বিক্রি হয়েছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। এখন ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি করছেন জিরা। রোজার ঈদের ৩৬০০ টাকা থেকে ৪২০০ টাকার এলাচ এখন বিক্রি হচ্ছে ২৮০০ থেকে ৩৮০০ টাকায়। লবঙ্গ রোজার ঈদে বিক্রি হয়েছে হাজার টাকা কেজিতে, আর এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়। দারচিনি ছিল ৪৩০ থেকে ৪৪০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায়। কিসমিসের কেজি ছিল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৭০ টাকায়। এই বিক্রেতা জানান, বাজারে এবার মসলা বেশি রয়েছে। সরবরাহ ভালো। কিন্তু ক্রেতা ও বিক্রেতা কম, তাই দাম কম।

খুচরা বাজারের আরেক দোকানি আব্দুল কাদের বলেন, প্রতিবার কোরবানি ঈদে মসলার দাম বাড়লেও এবার বাড়েনি। বরং কমেছে। এবার মসলার বাজার অন্যান্য সব বছরের চেয়ে ব্যতিক্রম।

এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ওয়েবসাইটে শুক্রবারের (২৪ জুলাই) বাজারদরে বলা হয়েছে, মসলার মধ্যে জিরা ৩০০ থেকে ৩৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে জিরার দাম ছিল ৩২০ থেকে ৩৮০ টাকা, অর্থাৎ জিরার দাম কিছুটা কমেছে। আবার দারচিনির দাম দেখানো হয়েছে ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়, এক সপ্তাহ আগে ছিল ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা। অর্থাৎ বাজারে দারচিনির দাম বেড়েছে। এলাচ বিক্রি হচ্ছে ২৭০০ টাকা থেকে ৩৫০০ টাকায়, এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকায়। অর্থাৎ বাজারে এলাচের দামও কমেছে।

এর আগে, চলতি বছরের মে মাসে মসলার দাম ১০ থেকে ২৫ ভাগ কমানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতি। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি’র সঙ্গে বৈঠকের পর ওই সিদ্ধান্ত আসে। সভায় গরম মসলার আন্তর্জাতিক বাজার ও বাংলাদেশে আমদানি মূল্য পর্যালোচনা করা হয়। তখন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো গরম মসলার মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়। পরে বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতি গরম মসলার মূল্য তালিকা ঘোষণা করে।

মূল্য তালিকা হলো— জিরা (ভারত) প্রতি কেজি ৩০০-৩৪০ টাকা, দারচিনি (চীন) প্রতিকেজি ৩১০-৩৩০ টাকা, দারচিনি (ভিয়েতনাম) প্রতিকেজি ৩৫০-৩৭০ টাকা, লবঙ্গ প্রতিকেজি ৬৮০-৭২০ টাকা, এলাচ প্রতিকেজি ২৮০০-৩২০০ টাকা, গোলমরিচ (সাদা) ৫৫০-৫৮০ টাকা, গোলমরিচ (কাল) ৩৬০-৩৮০ টাকা। কোরবানি ঈদ উপলক্ষে আরও কিছুটা দাম কমিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. এনায়েত উল্লাহ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আবহাওয়া

%d bloggers like this:
%d bloggers like this: