বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন

ব্যক্তিগত গাড়ি চালকদের একটি অংশ অপহরণ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে : ডিবি প্রধান

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : শনিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
ব্যক্তিগত গাড়ি চালকদের একটি অংশ অপহরণ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে : ডিবি প্রধান

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

রাজধানীর উত্তরা থেকে শেরপুর যাওয়ার পথে অপহরণ হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান হিমেল। দীর্ঘ একমাস তাকে আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দিয়ে কয়েক কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে আসছিল একটি চক্র। সর্বশেষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সুনামগঞ্জের তাহিপুরের দুর্গম পাহাড় থেকে উদ্ধার করা হয় হিমেলকে। গ্রেফতরা করা হয় অপহরণ চক্রের মূলহোতাসহ ১২ জনকে।

হিমেল অপহরণের ঘটনায় তদন্তে নেমে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে এ অপহরণের মূল পরিকল্পনায় ছিলেন ব্যক্তিগত গাড়ি চালক সামিদুল। এমনকি বিভিন্ন অপহরণ চক্রের সঙ্গে গাড়ি চালকদের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের লালবাগ বিভাগ।

শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মিন্টো রোডে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিমেল অপহরণের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) লালবাগ বিভাগ তদন্ত করছিল। এ মামলার তদন্তে ব্যক্তিগত গাড়িচালক গ্রেফতার করা হয়। এ চালকই অপহরণের মূলহোতা। চালক ছামিদুল ইসলাম যখন গাড়ি চালাতেন তখন তার ভেতরে লোভ জাগে; তার স্যারের মতো নিজের একটি গাড়ি থাকবে।

ছামিদুল প্রথমে তুরাগ এলাকার হানিফ বাবুর্চী নামের এক সাইটের ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপর পরবর্তী আলোচনা হয় ময়মনসিংহের দোবাউরা থানার ইউপি চেয়ারম্যান মামুনের সঙ্গে। তিনি একাধিকবার চেয়ারম্যান। হিমেলকে অপহরণ করে তার বাসায় রাখার পরিকল্পনা করা হয়। পরবর্তীতে হিমেলকে যখন অপহরণ করে তার বাসায় নেওয়া হয় কিন্তু টাকা পেতে দেরি হওয়ায় মামুন গাড়ি দিয়ে সীমান্ত এলাকায় হিমেলকে পাঠানো হয়। গাড়িতে করে হিমেলকে বর্ডারের একটি পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন সামিদুল ও মালেক, মোবারক, মানিককে নিয়ে চলে যায়। তখন থেকেই হিমেলের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। পরবর্তীতে ডিবি লালবাগ বিভাগ কাজ শুরু করে।

হারুন অর রশীদ আরও বলেন, পরবর্তীতে ডিবি লালবাগ শরীয়তপুরের চর অঞ্চল থেকে মাসুদকে গ্রেফতার করা হয়। মাসুদের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য নিয়ে ময়মনসিংহের দোবাউরা, নেত্রেকোনা, দূর্গাপুর এরপর তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে সোর্স নিয়োগ করা হয়। এ সোর্সের মাধ্যমে ডিবি জানতে পারে এ গ্রুপ শুধু অপহরণ করে না, তারা চোরা চালানের সঙ্গেও জড়িত। তারা গরু, চিনিসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। অপহরণের পর ভুক্তভোগীকে নির্যাতন করা হয়। যার ছবি ও ভিডিও পাঠানো হতো হিমেলের মায়ের কাছে।

সর্বশেষ তারা ৩০ লাখ টাকা দাবি করেছিল। কিন্তু এর মধ্যে ডিবির চারোদিক থেকে সাঁড়াশি অভিযানের কারণে তারা পেরে উঠতে পারেনি। এ সময়ে অপহরণকারীদেরও টাকা শেষ হয়ে যায়। কারণ ওপারের মেঘালয় পুলিশ, এপারের আমাদের তৎপরতার কারণে এক মাস পাহাড়ে থাকায় টাকা শেষ হয়ে যায়। এ সময়ে তারা টাকার যোগান দিতে গরু চুরি করে বিক্রি করে এরপর সেই টাকা দিয়ে পাহাড়ে অবস্থান করতো। পরে আমরা খবর পেলাম অপহরণকারীরা টাঙ্গুয়ার হাওরে আবারও অন্য একটি পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। এমন খবর পেয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের একটি নৌকা থেকে হিমেলের গাড়ি চালক সামিদুল, ১৭ মামলার আসামি মালেকসহ চারজনকে গ্রেফতার কার হয়। এ অভিযানে র্যাবও সহযোগিতা করে।

তাদের গ্রেফতারের পর ডিবি তথ্য পায় এ অপহরণের মূল পরিকল্পনা করা হয় তুরাগ থানা এলাকায় বসে। এরপর দোবাউরায় ইউপি চেয়ারম্যানের বাসায় বসে পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্ব ঠিক করা হয়। এ ঘটনায় মামুন ও হানিফ এ ঘটনায় নিজেদের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

আমাদের কাছে তারা স্বীকার করেছে তারা একাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। ভুক্তভোগীরা নানা কারণে তাদের টাকা দিয়েছে। কিন্তু এ ঘটনায় ডিবি পুলিশ নিয়মিত মোবাইল ট্রাকিংসহ বিভিন্ন ভাবে কাজ করেছে গেছে। পাশাপাশি মেঘালয় পুলিশের তৎপরতার কারণে তারা যে দুই তিন কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছিল সেটি নিতে তারা ব্যর্থ হয় এবং আমরা ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করি।

গাড়ি চালকরা অহরণ চক্রের হয়ে কাজ করছে উল্লেখ করে গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান বলেন, যারা ব্যক্তিগত গাড়িচালক নিয়োগ করার আগে সতর্ক হতে হবে। কারণ এ ঘটনায় সামিদুলের মাধ্যমে দেখেছি তার মতো বহু চালক এসব অপহরণ চক্র ও সন্ত্রাসীদের কাছে তথ্য দিয়ে থাকে। গাড়ি চালকরা পরিবারের সদস্যদের বিষয় বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করে। এসব তথ্যের কারণেই অনেক ঘটনা ঘটছে। সব তো আর আমাদের কাছে অভিযোগ আসে না। অনেকে টাকা-পয়সা দিয়ে মীমাংসা করে কিন্তু হিমেলের মা আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করায় এটা সম্ভব হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশ সাতজন ও র্যাব পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। হিমেলকে সীমান্তে কী উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জানতে চাইলে গোয়েন্দা প্রধান বলেন, আমাদেরও একটাই প্রশ্ন? যেখানে আমরা যেতে পারি না। কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওর, কলমাকান্তা, দূর্গাপুর, মেঘালয় এসব এলাকায় আমরা যেতে পারি না কিন্তু সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে, চোরাকারবারিদের নিয়মিত যাতায়াত হচ্ছে। দুই দেশের সিম অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এ মানুষগুলো কীভাবে যাচ্ছে, তাই এখন এসব অঞ্চলে আমাদের নিয়মিত নজর রাখতে হবে।

হারুন আরও বলেন, তবে আমরা চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িতদের নাম-পরিচয় পেয়েছি। অপহরণের সঙ্গে জড়িতদের অনেককে গ্রেফতার করেছি। তারা আদালতে স্বীকারোক্তীও দিয়েছে। আমাদের ডিবি এখনও কাজ করছে। আর যারা সীমান্ত এলাকায় কাজ করছে তাদেরও সতর্ক থাকতে হবে।

গাড়ি চালকদের টার্গেট করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে হারুন অর রশীদ বলেন, কেউ চাইলেতো কোনো ব্যক্তির তথ্য সহজে সংগ্রহ করতে পারে না। বড়লোকের সন্তান বা পরিবারের সন্তানকে অপহরণ করতে চায় তখন তারা গাড়ি চালকদের ব্যবহার করে গুরত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। হিমেলের ক্ষেত্রেও অপহরণ চক্রটি গাড়িচালক সামিদুলকে টার্গেট করে। আর সামিদুলেরও টার্গেট ছিল বড়লোক হওয়ার তাই তারা সহজে তাকে টার্গেট করতে পেরেছে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, মেঘালয়ের কেউ জড়িত আছে কি না সেটা জানতে আমরা তদন্ত করছি। আমার বেশ কিছু নাম ও নম্বর পেয়েছি। যেহেতু অপহরণকারীরা মেঘালয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি তার মানে ওপারের কেউ না কেউ তো জড়িত আছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আবহাওয়া