নতুন বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না সরকার : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশকে কোনোভাবেই পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব যে বাংলাদেশ যেন কখনোই আবার কোনো পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে ফিরে না যায়। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে মন্ত্রণালয় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

বুধবার (৫ আগস্ট) ফরেন সার্ভিস একাডেমির আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই-আগস্ট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস সময়। সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের স্মৃতি ধারণ করেই নতুন বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, আত্মমর্যাদা, সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের সঙ্গে সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট-পরবর্তী সময় মোটেও মসৃণ ছিল না। তখন প্রধান উপদেষ্টা আমাকে সরকারের দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানান। পরে তিনি আমাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার) হিসেবে দায়িত্ব দেন।

তিনি বলেন, তখন আমাদের সামনে অন্তত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথমত, প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তৃতীয়ত, পুরো রূপান্তর (ট্রানজিশন) প্রক্রিয়াটি যেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করা।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, নানা ধরনের বাধা ও সমস্যা থাকলেও আমরা তিনটি লক্ষ্যই অর্জন করতে পেরেছি। নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও এটিকে একটি চমৎকার নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমরা যেসব আশঙ্কা করেছিলাম, সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবে ঘটেনি। ফলে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে।”

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আন্দোলনের প্রতিটি শহীদ তাঁদের অসীম সাহস, নির্ভীক দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে আমাদের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। একই সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে যারা আমাদের মাঝে রয়েছেন, তাঁদের প্রতিও আমি গভীর সমবেদনা জানাই।

মন্ত্রী বলেন, তাদের ত্যাগ, সাহস ও অদম্য মনোবল দেশ ও মানুষের কল্যাণে আত্মোৎসর্গের আদর্শে আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

নিজের লিখিত বক্তব্যের বাইরে এসে তিনি বলেন, দুই মাস আগে ঠিক এই সময়ে আমরা কী পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম, তা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। অনেকে দেশে ছিলেন, আবার অনেকে বিদেশে ছিলেন। বিদেশ থেকে আমরা দেখেছি, কীভাবে আমাদের তরুণ-তরুণীরা নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, প্রাণ হারাচ্ছিলেন এবং আহত হচ্ছিলেন। সেই পরিস্থিতি দেখে নিশ্চুপ থাকা সম্ভব ছিল না।

তিনি আরো বলেন, একপর্যায়ে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি আমি আগে কখনো দেখিনি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তথ্যপ্রবাহ এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম অন্ধকার ও নৃশংস সময়। স্বাধীনতার পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচকভাবে ফিরে আসছে।

ড. খলিলুর রহমান আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা জটিল হয়ে উঠেছে এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ বাস্তবতায় দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করতে হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম বড় পরীক্ষায় সফলতার প্রমাণ। এ সাফল্যের পেছনে দেশের সব কূটনৈতিক মিশন ও কর্মকর্তাদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেন তিনি।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে ভালোবাসা, নিষ্ঠা, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এগিয়ে নেওয়াই সবার দায়িত্ব। বিশেষ করে পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি দেশের স্বার্থ রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতির নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থিতা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নির্বাচন শেষে তিনি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানালে প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে নির্দেশ দেন।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, ‘আপনি আমাকে এক অসম্ভব কাজ (ইম্পসিবল মিশন) দিচ্ছেন’। উনি (প্রধানমন্ত্রী) বললেন, ইম্পসিবল মিশনের জন্যই তো ফরেন অফিস।

ইউএনজিএ সভাপতির নির্বাচিত হওয়ার সাফল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে এটি খুবই কঠিন পরীক্ষা ছিল।

তার মতে, ওই সাফল্য প্রমাণ করেছে যে জুলাইয়ের শহিদরা দেশের কূটনীতিকদের ওপর যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব দিয়ে গেছেন, তা পালনের সক্ষমতা ও দৃঢ় ইচ্ছা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দিন তিনি প্রথমে হাসপাতালে গিয়ে জুলাইয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। “ফিরে এসে আমি অধ্যাপক ইউনূসকে বলেছিলাম, ‘স্যার, আমরা যেন কখনো না ভুলে যাই যে আমরা কী অবস্থায় তাদের রক্তের ওপর হেঁটে এসে এখানে বসেছি।’ এই কথাটি যেন আমরা সবাই মনে রাখি”, বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের এই ছেলেমেয়েগুলো ভয়াবহ এক দানবের হাত থেকে দেশটাকে ছিনিয়ে এনে আমাদের হাতে দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব ভালোবাসা, নিষ্ঠা, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই দেশকে আগলে রাখা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ড. খলিলুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের যে দায়, সেই দায়িত্ব কেউ যেন ভুলে না যান। প্রতিটি মুহূর্তে মনে রাখবেন, শহিদরা আমাদের হাতে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বভার দিয়ে গেছেন।

এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মু. নজরুল ইসলাম ও ফরেন সার্ভিস একাডেমির সেক্টর রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

দেশে ভোটার ১২ কোটি ৮৬ লাখ ৩২ হাজার ৫৫৫

নতুন বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না সরকার : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৫:৩৭:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশকে কোনোভাবেই পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব যে বাংলাদেশ যেন কখনোই আবার কোনো পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে ফিরে না যায়। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে মন্ত্রণালয় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

বুধবার (৫ আগস্ট) ফরেন সার্ভিস একাডেমির আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই-আগস্ট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস সময়। সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের স্মৃতি ধারণ করেই নতুন বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, আত্মমর্যাদা, সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের সঙ্গে সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট-পরবর্তী সময় মোটেও মসৃণ ছিল না। তখন প্রধান উপদেষ্টা আমাকে সরকারের দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানান। পরে তিনি আমাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার) হিসেবে দায়িত্ব দেন।

তিনি বলেন, তখন আমাদের সামনে অন্তত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথমত, প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তৃতীয়ত, পুরো রূপান্তর (ট্রানজিশন) প্রক্রিয়াটি যেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করা।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, নানা ধরনের বাধা ও সমস্যা থাকলেও আমরা তিনটি লক্ষ্যই অর্জন করতে পেরেছি। নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও এটিকে একটি চমৎকার নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমরা যেসব আশঙ্কা করেছিলাম, সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবে ঘটেনি। ফলে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে।”

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আন্দোলনের প্রতিটি শহীদ তাঁদের অসীম সাহস, নির্ভীক দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে আমাদের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। একই সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে যারা আমাদের মাঝে রয়েছেন, তাঁদের প্রতিও আমি গভীর সমবেদনা জানাই।

মন্ত্রী বলেন, তাদের ত্যাগ, সাহস ও অদম্য মনোবল দেশ ও মানুষের কল্যাণে আত্মোৎসর্গের আদর্শে আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

নিজের লিখিত বক্তব্যের বাইরে এসে তিনি বলেন, দুই মাস আগে ঠিক এই সময়ে আমরা কী পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম, তা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। অনেকে দেশে ছিলেন, আবার অনেকে বিদেশে ছিলেন। বিদেশ থেকে আমরা দেখেছি, কীভাবে আমাদের তরুণ-তরুণীরা নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, প্রাণ হারাচ্ছিলেন এবং আহত হচ্ছিলেন। সেই পরিস্থিতি দেখে নিশ্চুপ থাকা সম্ভব ছিল না।

তিনি আরো বলেন, একপর্যায়ে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি আমি আগে কখনো দেখিনি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তথ্যপ্রবাহ এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম অন্ধকার ও নৃশংস সময়। স্বাধীনতার পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচকভাবে ফিরে আসছে।

ড. খলিলুর রহমান আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা জটিল হয়ে উঠেছে এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ বাস্তবতায় দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করতে হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম বড় পরীক্ষায় সফলতার প্রমাণ। এ সাফল্যের পেছনে দেশের সব কূটনৈতিক মিশন ও কর্মকর্তাদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেন তিনি।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে ভালোবাসা, নিষ্ঠা, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এগিয়ে নেওয়াই সবার দায়িত্ব। বিশেষ করে পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি দেশের স্বার্থ রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতির নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থিতা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নির্বাচন শেষে তিনি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানালে প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে নির্দেশ দেন।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, ‘আপনি আমাকে এক অসম্ভব কাজ (ইম্পসিবল মিশন) দিচ্ছেন’। উনি (প্রধানমন্ত্রী) বললেন, ইম্পসিবল মিশনের জন্যই তো ফরেন অফিস।

ইউএনজিএ সভাপতির নির্বাচিত হওয়ার সাফল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে এটি খুবই কঠিন পরীক্ষা ছিল।

তার মতে, ওই সাফল্য প্রমাণ করেছে যে জুলাইয়ের শহিদরা দেশের কূটনীতিকদের ওপর যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব দিয়ে গেছেন, তা পালনের সক্ষমতা ও দৃঢ় ইচ্ছা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দিন তিনি প্রথমে হাসপাতালে গিয়ে জুলাইয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। “ফিরে এসে আমি অধ্যাপক ইউনূসকে বলেছিলাম, ‘স্যার, আমরা যেন কখনো না ভুলে যাই যে আমরা কী অবস্থায় তাদের রক্তের ওপর হেঁটে এসে এখানে বসেছি।’ এই কথাটি যেন আমরা সবাই মনে রাখি”, বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের এই ছেলেমেয়েগুলো ভয়াবহ এক দানবের হাত থেকে দেশটাকে ছিনিয়ে এনে আমাদের হাতে দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব ভালোবাসা, নিষ্ঠা, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই দেশকে আগলে রাখা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ড. খলিলুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের যে দায়, সেই দায়িত্ব কেউ যেন ভুলে না যান। প্রতিটি মুহূর্তে মনে রাখবেন, শহিদরা আমাদের হাতে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বভার দিয়ে গেছেন।

এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মু. নজরুল ইসলাম ও ফরেন সার্ভিস একাডেমির সেক্টর রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।