বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:০৬ অপরাহ্ন

করোনার ঝাঁজ, বন্যার গ্রাস, বৃষ্টির অঝোর ধারায় বিধ্বস্ত জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০
বন্যার পানির তোগে কুড়িগ্রামে বাঁধ ভেঙে ডুবে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা

দেশজুড়ে করোনার ঝাঁজ। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ। অবিরাম ঝরছে বৃষ্টির অঝোর ধারা। বিপদের ত্রিধারায় মানুষের জীবনছক এখন বিধ্বস্ত। সব কিছুই যেন গতিহারা। দুর্বিসহ এ সময়ে মানুষ হয়ে পড়েছে বড্ড অসহায়।
করোনার কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত জীবনে একরকম ‘বিষফোড়া’ হয়ে আসে বন্যা। এখনো দেশের ২৫ জেলা ভাসছে বানের পানিতে। বন্যাদুর্গত এলাকার বাসিন্দারা বানের সঙ্গে লড়তে গিয়ে ভুলতে বসেছে ভয়ংকর ছোঁয়াচে করোনাভাইরাসের কথা। ওই সব এলাকায় করোনার চিকিৎসাসেবাও একরকম বন্ধ।
এর মধ্যেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আকাশভাঙা বৃষ্টি। থামার যেন নাম নেই! ভারি বর্ষণ ও উজানের পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যার পানি ও ভারি বর্ষণে বিভিন্ন জেলায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ব্যাহত হচ্ছে কয়েকটি স্থানের রেল যোগাযোগ।

একদিকে বন্যার পানি, অন্যদিকে ভারি বর্ষণের ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তলিয়ে গেছে ফসল। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। ভেঙে গেছে বাঁধ। ডুবে গেছে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট। গবাদি পশু, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, থাকা-খাওয়া নিয়ে বানভাসি মানুষজন পড়েছে বিপদে। বন্যাজনিত রোগ, পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে ৩০ জুন থেকে গতকাল পর্যন্ত ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে কষ্টে দিন পার করছে কয়েক লাখ মানুষ।

এদিকে বিরামহীন বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার অনেক এলাকা তলিয়েছে। পানি উঠেছে সড়কে। জলাবদ্ধতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে নাভিশ্বাস উঠেছে রাজধানীবাসীর। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতেই জলজটে বিরক্ত নগরবাসী। নগরের এই অব্যবস্থাপনার জন্য তারা দুষছে দুই সিটি করপোরেশন ও ওয়াসাকে। ঢাকা দক্ষিণের গেণ্ডারিয়া, বংশাল, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, ধানমণ্ডি, জিগাতলা, শান্তিনগর এবং গ্রিন রোড এলাকায় এলাকার প্রধান সড়কে গতকালও জলাবদ্ধতা ছিল। ঢাকা উত্তরের উত্তরা, ভাটারা, গুলশান, বাড্ডা, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের এলাকা, মোহাম্মদপুর এবং মিরপুর এলাকাও ছিল পানিতে থইথই। জলাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা ও পরীক্ষা করতে আসা অনেক করোনা রোগী পড়ে বিপাকে।

শুধু দেশে নয়, উজানেও ভারি বর্ষণ চলছে দুই দিন ধরে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ায় গত রবিবার থেকে টানা বৃষ্টি ঝরছে। গতকাল মঙ্গলবার দেশের প্রায় সব জেলাতেই গড়ে ৫০ মিলিমিটারের ওপরে বৃষ্টি নেমেছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টি হয়েছে ১০০ মিলিমিটারেরও বেশি। জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে এমনিতেই দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর মধ্যাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলো বন্যায় ডুবেছে। গত দুই দিনে দেশের ভেতরে এবং উজানে ভারি বর্ষণের ফলে নদ-নদীর পানি ফের বাড়তে শুরু করেছে। ফলে ওই সব জেলার বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হচ্ছে।

দেশের ২৮টি পানি পর্যবেক্ষণ স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে পানি বইছে। চলমান বন্যা দেশের ২৫ জেলায় বিস্তৃত হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ঘরের ভেতর পানি ঢোকায় বানভাসি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে রাস্তার ওপর। বন্যার পানি ও ভারি বর্ষণে সুনামগঞ্জ বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পানি ঢুকে পড়ায় মঙ্গলবার হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে রোগীরা পড়েছে মহাবিপদে।

এ ছাড়া সুনামগঞ্জের তাহিরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও পানি ঢুকেছে। নিচতলায় সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দ্বিতীয় তলায় নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চলাচলের রাস্তা বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সোনারগাঁ পৌর এলাকার সাহাপুর এলাকার হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় কয়েকটি গ্রাম তলিয়ে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে রোগী ও এলাকাবাসী।
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে করোনা ইউনিটে পানি উঠেছে। এর আগে গত সোমবার বন্যার কারণে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে একটি হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই দিন ভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে পানি ঢোকায় সেখানকার সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, ভারতের রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত মৌসুমি বায়ু বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ঠেকেছে। আবহাওয়া অফিসের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও বৃষ্টি থাকবে। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের সব জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। ভারি বর্ষণও হতে পারে কোথাও কোথাও।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তিন কোটি ২১ লাখ টাকা নগদ ও ৯ হাজার টন চাল দেওয়া হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আবহাওয়া

%d bloggers like this:
%d bloggers like this: